লেখকের প্রেম ১ম পর্ব

গতকাল প্রেমিকার মায়ের সাথে তুমুল ঝগড়া করেছি। ঝগড়ার কারণটা খুব তুচ্ছ। কিন্তু মহিলার কাছে এটাই আকাশ-পাতাল কারণ। আমার মতো ছেলের সাথে রাতদুপুরে কথা বলার অপরাধে তিনি তার মেয়ের ফোন কেড়ে নিয়েছেন। দুদিন পর সাবিলা তার এক বান্ধবীর ফোন থেকে আমাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে কথাটা জানাল। তার শেষ কথা ছিল, আমাকে প্লিজ তুলে নিয়ে যাও…! আমি তাকে তুলে না আনলেও তার ঠিকানায় জমানো টাকা থেকে একটা নূতন ফোন পাঠিয়ে দিয়েছি। আন্টি নাকি এই ফোনটাও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাবিলা চোখে-তে রক্ত এনে দাঁত-মুখ কুঁচকে বলেছিল, খবরদার! ফোনটা টাচও করবে না। এটা তুমি কিনে দাও নি। আমার জামাই কিনে দিয়েছে।
আন্টি ঠিক সেদিনই রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমাকে ফোন দিলেন। রাগ ধরে রাখতে না পেরে কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করে বললেন, তুমিই তাহলে ফোনটা কিনে দিয়েছো। রাইট?
আমি ফ্যালফ্যাল করে হেসে বললাম, জি আন্টি। আপনাকে আসসালামু আলাইকুম।
আগেও একবার সালাম দিয়েছিলে। প্রতিটা কথায় সালাম দাও নাকি?
জি আন্টি, অভ্যাস। আসসালামু আলাইকুম।
শাট আপ! এতবার সালাম দেয়া লাগবে না।
জি আচ্ছা, শোকরিয়া।
আন্টি কিছুটা রাগ কমিয়ে এনে বললেন, সাবিলা তোমাকে ‘জামাই’ বলে সম্বোধন করেছে। এটা কেন? তুমি কি ওকে বিয়ে করেছো?
আমি হাসিমুখে বললাম, জি না। তবে করব সামনে ইনশাল্লাহ। দোয়া রাখবেন।
দোয়া রাখব, নাকি পুলিশ রাখব -তা তো সময়েই বলে দিবে।
আন্টির চোখেমুখে বিজয়ের হাসি। আমাকে ভাল করে একটা ভয় দ্যাখানো গেছে। এই ভয়ে আমি কাবু হয়ে আর উঠতে পারব না বলে তিনি ভাবছেন। কিন্তু এই জগতে অনেক কিছুই উল্টো পথে হাঁটে। তার সমগ্র বিজয়কে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে আমি ফ্যালফ্যাল করে হেসে বললাম, জি আচ্ছা। পুলিশও রাখতে পারেন। আমার দুলাভাই একজন পুলিশ অফিসার। উনিও বিয়েতে থাকবেন। আর আমার এক ভাই আর্মি। তাকেও দাওয়াত করা হবে। আপনি চাইলে আরও কয়েকজন পুলিশকে দাওয়াত দিতে পারেন। আমি আরও ভাবছিলাম, ঢাকা শহরের সব ট্র্যাফিক পুলিশকে দাওয়াত দিব। তাঁরা এত কষ্ট করেন সারাটাদিন, অথচ ড্রাইভার আর পাবলিকের গালি ছাড়া কিছুই পান না। তারা এবার একটা বিয়া খাক। আইডিয়া-টা কেমন হলো?
আন্টি ফোন ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তার সামনে না থেকে বেঁচে গেছি -বলে হয়তো আমার ভাগ্যকে স্যালুট জানাচ্ছেন। তার গলা প্রায় ভারী হয়ে আসছে। গলা ভারী হয় দুটা কারণে, ১. কান্না পেলে। ২. রাগের চূড়ান্ত মুহূর্তে। তিনি রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে বললেন, তুমি কিভাবে বিয়ে করবে, তা আমি দ্যাখব। আর কাকেই-বা করবে, তাও দ্যাখব। সাবিলাকে বিয়ে করবে? যোগ্যতা কি? কি করো তুমি?
আমি কিছুটা গৌরবের সাথে বললাম, আমি শব্দ শ্রমিক।
কি কি? কি তুমি? শ্রমিক?
জি, শব্দ শ্রমিক।
মানে কারখানায় কাজ করো?
জি না। লেখালেখি করি। শব্দের সাথে শ্রম মিশাই।
আন্টি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কথাটা তার কান থেকে মাথায় পৌঁছুতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর হো হো করে ব্যঙ্গার্থ হেসে বললেন, তুমি লেখক?
জি।
তুমি লেখক হয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছো?
জি। লেখক হয়ে আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছি। বিয়ে করতে এসে লেখক হয়ে যাই নি।
স্টপ নাউ! লেখকদের ইনকাম আমার জানা আছে। চুল দাড়ি বড়, গাঁয়ের তামাকের গন্ধে কেও পাশেও যেতে পারে না। লেখকদের আশেপাশে তো কাউয়ারাও ভীড় করে না। তুমি মেয়ে পাবে, ভাবলে কিভাবে? অবশ্য এম্বিশন থাকা ভাল।
আপনার মেয়ের এব্যাপারে কোনও অভিযোগ নেই। ও লেখক বিয়ে করতে রাজি আছে।
আমি রাজি নই।
দুঃখিত, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করব, আপনাকে নয়।
মহিলা হতভম্ব হয়ে গেলেন। খুব সম্ভব তার মুখের উপর এতবড় কথা কেও কখনও বলে নি। আমার মতো ছোঁকড়াদের এত বেশী সাহস হয় কি করে! ‘দ্যাখো, আমি তোমাকে শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি, আর কখনওই আমার মেয়েকে ফোন দিবে না। তাকে যে ফোনটা কিনে দিয়েছো, তাও নিয়ে যাবে। তা না হলে হাজতে বসে লেখালেখি করবে। যত্তসব ফাযিল কোথাকার!’
জি শোকরিয়া! আপনার মেয়েকে আর ফোন দিব না। আমি তো ফাযিল, তাহলে আপনার স্বামী কি? সে খেয়াল আছে? সাবিলার বান্ধবীদের সাথে সারাটাদিন কি করে বেড়ায়, সেগুলো আগে দ্যাখুন। নিজের স্বামীকে ঠিক করুন, তারপর অন্যের স্বামী নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবেন। যত্তসব!
মহিলা হকচকিয়ে গেলেন। তার স্বামীর সাথে বেশ কিছুদিন ধরে তার মৌন ঝগড়া চলছে। এই ধরনের ঝগড়ার মাঝখান দিয়ে এসে কেও তুচ্ছ কিছু বলে ফেললেও সিরিয়াসলি নিতে ভাল লাগে। মহিলারও তেমনি হয়েছে। তিনি হঠাৎই গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার স্বামী কি করেছে?
কি করেন নি, তাই বলুন। সাবিলা তার বান্ধবীদের নিয়ে বাসায় যায়, আর বুড়াটা মা মা বলে কাছে টানে। আদরের নাম করে এখানে-ওখানে হাত দেয়। চুল, দাড়ি সব পেকে শনপাপড়ি, কিন্তু মনটা এখনও তরুণ। আর বেশী কিছু বলতে পারব না। এখনকার জন্য বিদায়। আসসালামু আলাইকুম।
মহিলা ‘এই শোনো শোনো’ বলে কিছুক্ষণ চেঁচালেন। কিন্তু কোনও লাভ হলো না, আমি ফোন রেখে দিলাম।
মহিলা রাগে অগ্নিমূর্তি হয়ে গেছেন। তার মনে হল, তিনি এতদিন ধরে যা ভেবে এসেছিলেন, তা সত্যই হলো তাহলে…! রাগে কাঁঁপতে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে সংযত করে তার স্বামীর রুমে এলেন। তার স্বামী মহিন আকবর সাহেব সাবিলার বান্ধবীদের সাথে কথা বলছিলেন। আমার কথা এভাবে সত্য হয়ে যাবে, তা ভদ্রমহিলা ভাবতেই পারেন নি। মহিন আকবর সাবিলার বান্ধবী তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, মা, আমি বললামই তো আমি তোমার জন্য সবসময় দোয়া করি।
তিতির ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, আমি বিশ্বাস করি না। যদি দোয়া করতেনই তাহলে আমি পরীক্ষায় ফেল করলাম কেন? আমার মাথা ছুঁয়ে বলেন, দোয়া করি মা তোমার জন্য।
তিতিরের একটা বদভ্যাস হলো, সে কাওকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মাথায় কেও হাত রেখে শপথ করছে। মহিন সাহেব উপায়ান্তর না দ্যাখে হাসিমুখে তিতিরের মাথায় হাত রেখে শপথ করলেন। সাথে সাথে কোথা থেকে উড়ে চলে এলেন তার স্ত্রী। মহিন সাহেবের হাত তখনও তিতিরের মাথায়। ভদ্রমহিলা দাঁত-মুখ কুঁচকে ফেলার সাথে তিনি হাত সরিয়ে নিলেন। সাবিলা পরিস্থিতি উল্টোদিকে যাচ্ছে দ্যাখে তিতিরকে নিয়ে রুমে নিয়ে গেল। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে মহিলার চোখে জল চলে আসছে। তিনি ভারী গলায় সারা শহরের কাক ডাকা রাগ এনে বললেন, ও আচ্ছা, এখন তাহলে কচি মেয়েগুলার মাথায় হাত রাখা হচ্ছে, তাই না? আমার মাথায় হাত রাখার সময় কি বল তুমি, বল, আমার মাথায় তেল। তেলা মাথায় হাত দিলে তোমার হাত ধুতে হয়। আর কচি মেয়েদের মাথা খুব শুকনা, তাই না? আমি চললাম।
ভদ্রমহিলা চলে গেলেন। মহিন সাহেব হতভম্ব মুখে সোফার সাথে সেঁটে রইলেন। পরিস্থিতি এত খারাপ হবে, তিনি কল্পনাই করতে পারেন নি। তিতির নিশ্চয়ই কথা গুলো অন্যরুম থেকে শুনেছে। মহিলারা রাগের সময় কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না, এটাই বড় সমস্যা। মহিলা চলে গেলেন কিন্তু মহিন সাহেবকে এবার আরও অবাক করে দিয়ে তিতির আর সাবিলার বান্ধবী সবগুলোকে এনে বললেন, তোমরা বস। তিতির, তুমি চুপ করে বস। বেশ কিছুদিন ধরে তুমি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাসায় আসছো, আজ এটার সুরাহা হবে। এভাবে আর কতদিন চলবে…? আমি এক্ষুণি কাজী ডেকে এনে সাবিলার বাবার সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দিব। শালা বুইড়া!
চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *