লেখকের প্রেম ২য় পর্ব

ভূতেরা কি প্রেম করে…? তারা কি বিয়ে করে? বাচ্চা নেয়? তাদেরও কি মানুষের মতন যৌনাঙ্গ আছে?
সবগুলো চোখ বক্তার দিকে ঘুরে গেল। এখন সিরিয়াস সময় যাচ্ছে। মেয়ের বান্ধবীর সাথে বাবার বিয়ে, ঠিক এই মুহূর্তে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা সাজে না। কিন্তু লিজা প্রায়শই কিসের ভেতর কি -আনবেই। ভদ্রমহিলা চোখমুখ দিয়ে আগুন ছেড়ে বললেন, এই যে খুকি শোনো, পরিস্থিতি অন্যদিকে নেবার চেষ্টা করবে না। বেয়াদব মেয়ে একটা! বাসায় এসে সাবিলার রুমে চলে যাবে, ওর বাবার সাথে তোমাদের এত কি! সেদিন তুমি কি বলেছো আমি শুনেছি। বলেছিলে না, বত্রিশটা দাঁত বের করে, আল্লা আংকেল, আপনি এখনও কি হ্যান্ডসাম। যেকোনও মেয়েই পাগল হয়ে যাবে। বাবার সমতুল্য একজন মানুষের সাথে কেও এভাবে কথা বলে…? ফাযিল একেকটা! বাসায় আসো কি বুড়াটাকে দ্যাখতে…? কি আছে ওর মধ্যে? মাঝেমধ্যে বুড়াটাও হাসি হাসি তোমাদের সালামি দেয়, এটা নিতেই কি সবগুলা দাঁত বের করে প্রশংসা করতে হবে…? যত্তসব!
তিতিরের কান্না পাচ্ছে। সে ভাবতেও পারে নি, এত বুড়ো কারও সাথে তার বিয়ে হতে পারে? আন্টি কি মজা করছেন নাকি সিরিয়াস? তিতির চোখমুখ শক্ত করে বসে আছে। বান্ধবীর মা হতে পারার মধ্যে গৌরবের কিছু নেই। ধিক্কারের অনেককিছু আছে। সাবিলা লজ্জায় প্রায় মরে যাবে -টাইপ অবস্থা। বান্ধবীদের সামনেই তার বাবা-মা ঝগড়া বাঁধান। এমনিতেই মান-ইজ্জত সব অনেক আগেই চলে গিয়েছিল, এখন অবশিষ্টাংশও যাচ্ছে।

২.
বেশ কিছুদিন ধরে একটা ঝামেলায় আছি। আমাদের বাথরুমটা পিচ্ছিল হয়ে গেছে। যেই যাচ্ছে, আছাড় খাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেকবার তা অনেকভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন। আমি নিজেও তিন তিনবার আছাড় খেয়ে করুণ দশা। আজ তারচে’ও আরও খারাপ একটা ঘটনা ঘটে গেল। কে যেন কাপড় ধোয়ার জন্য বালতি-তে কাপড় ভিজিয়েছে, পাশে রেখেছে ‘নীল’, নীল রেখেছে ভাল কথা, কিন্তু খারাপ কথা হল, নীলটা রেখেছে উন্মুক্ত অবস্থায়। আমি নিয়মমতো উপুড় হয়ে আছাড় খেয়ে সারা শরীরে নীল মেখে নিলাম। নিজের অবস্থা এরচে’ করুণ হয় নি কখনওই। আমার সব কাপড় একটু আগে ধুতে দেয়া হয়েছে। এখন যেটা পরণে আছে, তা পরেই আবার টিউশনিতে যেতে হবে। একটা ছেলের জীবনে বোধহয় অনেকগুলো কষ্টের মধ্যে এটাও অন্যতম। আমি নীলে মাখামাখি হয়ে টিউশনিতে গেলাম। একটা ক্লাস টুয়ের মেয়ে পড়াতে হয়। তার বাবা-মায়ের অনুরোধেই পড়াতে হচ্ছে। এর আগে তাদের পাশের বাসায় একটা মেয়েকে পড়াতাম। মেয়েটা তুচ্ছ অভিমানে আত্মহত্যা করেছিল। বর্তমানে যাকে পড়াই, তার জন্য প্রায় দশ হাজার টাকার খাটুনি খাটতে হয়। পড়া কখনওই তৈরি করে রাখবে না, ক্লাসে কি পড়িয়েছে তাও বেমালুম ভুলে যাবে, সবসময় গল্প করতে চাইবে, তার কোন বান্ধবী কেমন, বড়দের মতো- আমার প্রেমিকা কেমন আছে -এসব ছাইপাঁশ আলাপ-সালাপ করতে করতেই আমার জীবন শেষ।
মেয়েটার নাম ইমা। মাথার দুপাশে ঝুঁটি করে, তাকে গোলাপি-রঙা ড্রেসে মানায় দ্যাখে সবসময় গোলাপি ড্রেসই পরে। আজ প্রথম দশমিনিট আমার নীলের এই বেহাল অবস্থা দ্যাখে ঠোঁটের সামনে দু’হাত চেপে হাসতে হাসতে একবার চেয়ার থেকে পড়ে বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, আম্মু আম্মু, একটু এদিকে আসো না প্লিজ! দ্যাখো ভাইয়ার কি অবস্থা! হা হা হা!
আমি বোকার মত ড্যাবড্যাব করে সেদিকে তাকিয়ে আছি অসহায় চোখে। মানুষের কষ্টে আমরা নির্মল আনন্দ পাই। কারণ মানবিক আর পাশবিক দুটাই আমরা আমাদের ভেতরে লালন করি। শিশুদের বেলায়েও কি তা সত্য…? আন্টি অন্যরুম থেকে দৌঁড়ে এলেন। আমার শার্ট নীলে ভিজে চটাচটি হয়ে গেছে দ্যাখে তিনিও পেট ধরে হো হো করে হেসে উঠলেন। এই ভদ্রমহিলার বেশী হাসি পেলে তিনি পেট ধরে হাসেন। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, এবার আন্টিও কি বাসার অন্যান্যদের এই দৃশ্য দ্যাখাতে নিয়ে আনবেন কিনা। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কিছুক্ষণ পর তাদের হাসিও বন্ধ হল। সবকিছুরই একটা লিমিট আছে। মানুষ কেন, পাগলেও একটানাভাবে হাসতে পারবে না। এই যে আবার একটা ভুল কথা বলে ফেললাম। পাগল কি মানুষ না…?
আমি ইমার দিকে তাকিয়ে আছি। তার ঠোঁটে এখনও হাসি, সামনের দাঁত দুটো নেই, তার হাসি দ্যাখলে আমারও হাসি আসে।
ইমা।
জি ভাইয়া।
গতকালের অংক দুটা করেছিলে?
উঁহু।
আমি সরুচোখে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, কেন?
সে দার্শনিকের মতন গম্ভীর গলায় বলল, এত পড়াশুনা করে কি হবে? শেষমেশ তো সাবিলা আপির মতো বিয়ে করে কোনও লেখকের সাথে ঘর বাঁধব। অবশ্য বাবা বলেন, লেখকদের টাকাকড়ি কম, তাদের সাথে থাকতে হলে নাকি রাজ্যের কষ্ট নিয়ে থাকতে হবে। তাই হয়তো আমাকেও চাকুরি করতে হবে, কি বল তুমি?
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে। ছোট ছোট মেয়েগুলো এত বড়ভাবে কথা বললে রক্ত উঠারই কথা। পড়া নেই, লেখা নেই, সামনে আবার দুটা দাঁতও নেই; এরইমধ্যে আবার বিয়ের পরবর্তী আলোচনা। আমার ভেতর সামান্য অপমানবোধও কাজ করছে। আজকালকার ছোট ছোট বাচ্চাদেরকেও লেখকদের থেকে দূরে থাকবার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এটা অন্যায়, এটা স্পষ্টত দেশদ্রোহিতা।
আমি কড়াচোখে ইমার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি পড়ায় ভালো না হলে কেও তোমাকে বিয়ে করবে না বাবু।
ইমা আমার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকরভাবে ভেঙ্গচি কেটে বলল, বাবু! কে বাবু? কাকে তুমি বাবু বলছো? যত্তসব! এই শোনো, একটা ভালো কথা মনে করিয়েছো। সেদিন দ্যাখলাম, একটা বড়ভাইয়া রিকশায় তার পাশে বসে থাকা একটা বড় আপুকে ‘বাবু’ বলছে। তুমি আমার মতো ছোট মেয়েকে বাবু বলো, আবার বড়রা বড়দেরকেও বাবু বলে, এসব কি শুনতেছি…!
আমি হতভম্ব মুখে ইমার দিকে তাকিয়ে আছি। ছোট মেয়ে হলেও তার চিন্তা যুক্তিযুক্ত। এক সময় ‘বাবু ‘ বলতে ছোট বাচ্চাদের বুঝানো হতো। যুগের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিবর্জন, পরিশোধনে একসময় আচরণগতভাবে ছোটদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হত। হিন্দুরা তাঁদের বাবাকে বাবু বলে। কালের বিবর্তনে এখন তা তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রেও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিশেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কথাটা বড় সামান্য নয়। ভাবিলেই আশ্চর্য হতে হয়। সেদিন একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। একটা দুইবছরের বাচ্চা ছেলেকে ‘উম্মাহ আমাল বাবুতা’ বলে একটা তরুণী হৈ হৈ করে জড়িয়ে ধরল। খুব সম্ভব তিনি বাচ্চাটার খালা শ্রেণীর। মেয়েটার পাশে তার প্রেমিক দাঁড়ানো ছিল। মেয়েটা বাচ্চাটার গালে শব্দ করে একটা চুমু খেল। বাচ্চাটার মুখে পবিত্র হাসি। সে চোখ বড়বড় করে মেয়েটার দিকে মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা তার প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, বাবুটা কি সুন্দর, তাই না বাবু…? বাবু অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে। সে কনফিউজড, তাকে বাবু বলা হয়েছে, আবার বুড়ো একটা ছেলেকেও বাবু বলা হয়েছে। এই পৃথিবীতে কত বিচিত্র জিনিসই না ঘটে! বড় হলে সে এমন একটা কৃত্রিম পৃথিবী পাবে। বাচ্চাদের জন্য একটা সুন্দর, নির্মল, ভেজালমুক্ত পৃথিবী গড়ে যেতে না পারার দুঃখ, আমার কোনওদিনও যাবে না।
আমি রাগী রাগী গলায় বললাম, ইমা, তুমি পড়।
মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল, উঁহু! আচ্ছা ভাইয়া শোনো… তার গলা খাদে নেমে এল, সে চুপিচুপি আমার কানের পাশে তার মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, আচ্ছা ভাইয়া, বাবু কিভাবে হয়?
আমি হকচকিয়ে গেলাম। ভালো ঝামেলায় পড়ে গেলাম। আজ খুব সম্ভব, আমার ‘ব্যাড ডে’ (Bad Day)। সবকিছুই আজ শত্রুর মতন আচরণ করছে। মেয়েটাকে এখন জীববিজ্ঞান বোঝানো যাবে না। আকাশ থেকে বাবু আসে বললেও সে মানতে চাইবে না। কি বলব ভেবে উঠতে না পারার আগেই ইমা বলে উঠল, সেদিন কি হয়েছে জানো? আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে আছে। আমার বান্ধবী না, সহপাঠী। আমি সবাইকে বান্ধবী বানাই না। মেয়েটা সেদিন খুব করে কাঁদল। ঠিক তখনি একটা ছেলে তার গালে চুমু খেল। সে দুদিন স্কুলে আসে নি। পরে যখন আসল, তখন সে বলল, তার নাকি বাবু হবে। সে নাকি কোন বইয়ে পড়েছে, একটা মেয়ের কাঁদার সময় কোনও ছেলে তার গালে চুমু খেলে মেয়েদের বাবু হয়। কথাটা কি সত্য ভাইয়া…?
আমি প্রতিদিন বেত এনে পড়াই। না মারলেও বেত দিয়ে ভয় দ্যাখাই। আজ বাথরুমে আছাড় খাওয়ার পরে বেত আনতে ভুলে গেছি। আমি দাঁতমুখ কুঁচকে বললাম, এসব ফালতু কথায় বিশ্বাস করবে না। গালে চুমু খেলে বাচ্চা হলে বাঙলাদেশের জনসংখ্যা থাকতো দুইশ কোটি। চুপ করে পড় তুমি।
ইমা খুব খুশি হয়ে বলল, সত্যি?
হুম।
ইমা জোরে জোরে ডাকল, সোমা এই সোমা, এদিকে আয়।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, ভেতরের রুম থেকে একটা পিচ্চি মেয়ে চলে এল। ইমা বিজয়ের দৃষ্টিতে সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, শোন, গালে চুমু খেলে বাবু হয় না। ভাইয়া বলেছে। ভাইয়া সব জানে।
সোমা আমার দিকে আশার চোখে তাকিয়ে বলল, সত্যি ভাইয়া?
আমি অবাক গলায় বললাম, হ্যাঁ।
সোমা একটা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাকে খুব নিশ্চিন্ত দ্যাখাচ্ছে। সে গর্ভবতী হওয়ার টেনশনে ছিল। আমি তার টেনশনটা দূর করলাম। ঠিক এমন অসময়ে আন্টি হাসিমুখে নাস্তা নিয়ে চলে এলেন। তিনদিন পর নাস্তা এনে তার চোখেমুখে বিজয়ের হাসি। যেন ছেলে টিউটরকে নাস্তা দেয়াটাই অনেক বড় ভালো কাজের উদাহরণ, টাকা দেয় এই তো বেশী। ছেলেদের আবার এত নাস্তা কিসের? তারা টঙে বসে পকেটে টাকা থাকলে চা-সিগারেট খাবে, মেসে গিয়ে যদি দ্যাখে ভাত আছে -তাহলে খাবে, নইলে উপাস। ছেলেদের এত শখ থাকতে নেই। শখ হচ্ছে ছেলেদের বিপরীত শব্দ। আন্টি আমার সামনে নাস্তা রাখতে রাখতে হাসি হাসি মুখ করে বললেন, কি নিয়ে কথা হচ্ছিল? আর সোমা মা, তুমিও কি ভাইয়ার কাছে পড়বে নাকি?
আমি ব্যস্তভাবে কিছু বলার আগেই ইমা ফাঁকা দাঁত দ্যাখিয়ে খিলখিল করে হেসে বলল, আম্মু জানো, ভাইয়া আমাদের বাবু কিভাবে হয়, তা শিখাচ্ছেন। সোমার বাবু হবে কিনা তাও বলেছেন। তুমি বলেছিলে না, আমি হাসপাতাল থেকে এসেছি। এটাও মনে হয় সত্য না। চুমু খেলে বাবু হয় না, ভাইয়া বলেছে। তাহলে হাসপাতাল থেকে কিভাবে বাবু আসবে? ভাইয়া, আম্মুকে তুমি বলো তো, হাসপাতাল থেকে বাবু আসে কিনা।
আন্টির চোখমুখে এতক্ষণ হাসি লেগে ছিল। তা এখন ক্রমশই রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে। আমার পা অসাড় হয়ে আসছে। আজকে আমার আসলেই ব্যাড ডে।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *