লেখকের প্রেম ৫ম পর্ব

আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। চিন্তায় পড়ে যাবার মতনই ইস্যু। মেয়েদের ব্লাউজ চুরি করা ক্ষমার অমার্জনীয় অপরাধ। মহিন সাহেবকে এতদিন ভাল মানুষ হিসেবে জেনে এসেছি। এখন তার উপর থেকে সমস্ত বিশ্বাস উড়ে গেছে। ওপাশ থেকে আন্টি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, বাবা, তোমার আংকেলের চুরি করার মধ্যেও একটা ধারা আছে। যেমন- সে লাল, শাদা আর নীল রঙের ব্লাউজ ছাড়া অন্যকোনও ব্লাউজ চুরি করবে না। তার কাছে এই তিনটে রঙই নাকি উত্তেজক বর্ণ! ব্লাউজ চুরি করে আমাকেও তো দেয় না, রাত হলেই দ্যাখি বেটা অই ব্লাউজগুলো হাতে নিয়ে শুঁকে শুঁকে দ্যাখে। কেমনতর মানুষ এবার দ্যাখো! আর তুমি বল, এর আরেকটা বিয়ের দরকার নেই? অবশ্যকরণীয়! না করলে বুড়াটা বাঁচবে না। বাবা দ্যাখলা, পুরুষ মানুষ কেন অমানুষ? পুরুষজাতি বৌ মারা গেলে তারা পরদিনই আরেকটা বিয়ে করে হাসিমুখে নতুন বৌয়ের এখানে-সেখানে চুমু খায়। কিন্তু মেয়েরা হলো মায়ের জাতি। হাজারটা বাঁধার পরেও তারা একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়। বাবা, এখনই তুমি আমার বাসায় আসো। নগদে দ্যাখাব বুড়াটার অপকীর্তি।
আমি বিপদে পড়ে আছি। নগদে মহিলার বাসায় গেলে কোনও সমস্যা হবে না। ইদানীং টাকাপয়সা হাতে নেই, তবে যথেষ্ট সময় আছে। সময় এবং টাকাকে একসাথে পাওয়া গেলে বেশ হয়। কিন্তু দুটাই যে সাপ আর বেজি; পাশাপাশি থাকতে অনিচ্ছুক।
পাশের বাসা থেকে কোনও সাড়াশব্দ আসছে না। নূতন বিবাহিত দম্পতি উঠেছে পাশের ফ্ল্যাটে। সিরাজ সাহেব হাইস্কুলের গণিতের টিচার। সদ্য বিয়ে করে এসেছেন। লোকে নানান বাজে কথা বলছে। তিনি তাতে মনঃক্ষুণ্ণ হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি সর্বদা মাথানিচু করে চলেন। কারও প্রশ্নের জবাব দিলেও তা খুবই সামান্য কথায়। সবার অভিযোগ দুটা-
১. সিরাজ সাহেব দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
২. পাত্রীর বয়স কম।
জানা গেছে, পাত্রীর বয়স তেরো বছর, পাত্রের বয়স সাঁইত্রিশ বছর।
আমি সাবিলাদের বাসার দিকে যাচ্ছি। জহিরের দোকানে একটা চা আর একটা সিগারেট খেয়ে শ্বশুর বাড়ি যাব। জহিরের দোকানে ঢুকেই দ্যাখি, সিরাজ সাহেব মাথানিচু করে বসে চা খাচ্ছেন। আমি তার পাশে বসলাম। তিনি তাতে কোনওরূপ ভ্রুক্ষেপ বা অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন না। তিনি বোধহয় একপ্রকার ধরেই নিয়েছেন আমিও তাকে অন্য সবার মতই ঘৃণা করি। আমি চা-তে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, সিরাজ সাহেব।
তিনি আগের মতই মাথানিচু করে বললেন, জি?
জীবনটা ভাল আছে?
আছে।
আপনার স্ত্রী মাশাল্লা অনেক সুন্দরী।
থ্যাংক ইউ।
আমি খুব শান্ত গলায় বললাম, শোনেন ভাই, মানুষ হিংসা ছাড়া কিছুই করতে পারে না। আপনার স্ত্রী সুন্দরী, তাই সবার গা জ্বলে, এসব নিয়ে ভাববেন না। আপনাদের জন্য শুভকামনা। কিশোরী মেয়েরা আবেগী হয়। এই বয়সে জান-প্রাণ দিয়ে ভালবাসবে। এই ভালবাসাটা রক্ষা করা কিন্তু আপনার দায়িত্ব। মেয়ে বড় হলেই দ্যাখবেন, মেয়ের ইন্টারেস্ট আস্তে আস্তে কমে আসবে। অবহেলা করবেন না তখন, সাবধান! ছোট মেয়েদের ভালবাসা হচ্ছে স্বচ্ছ, একেবারে পিউর। যে ছেলে এই ভালবাসাটা ধরে রাখতে পারে, ডিপ্রেশন তার এবং তাদের বিপরীত শব্দ হয়ে যায়।
সিরাজ সাহেব খুব খুশি হলেন মনে হলো। তিনি আমার দিকে ফিরে মিষ্টি করে একটা হাসি দিলেন। কৃতজ্ঞতামূলক হাসি। আমি তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীর গলায় বললাম, আপনারা কি প্রেম করে বিয়ে করেছেন, নাকি বিয়ে করে প্রেম করছেন?
সিরাজ সাহেবকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা হয়েছে। তিনি এটার উত্তর দিতেও পারেন, আবার নাও পারেন। আমি ততক্ষণে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়েছি। সিরাজ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন, প্রেম করে।
আমার চোখ কপালে উঠে গেছে। এত অসম বয়সের প্রেম হয় কি করে? মনের ভেতর খুঁতখুঁত করছে, ঠিক এমন সময়েই তিনি গম্ভীর মুখে বলতে থাকলেন, অসম বয়স যদিও। তবুও হয়ে গেল। অনেকে বাঁকা চোখে ব্যাপারটাকে দ্যাখে। এটা কি ঠিক? আমাদের প্রাণের রাসূল স. আয়েশা রাঃ -কে যখন শাদি করেন, তখন মা আয়েশার বয়স ছিল ছয় বছর। কম বয়স, তাতে কি! রাসূল করেন নি? এটা কি ইসলামে নিষেধ? বয়স কি ভালবাসার চাইতেও দামী? আমাদের রাসূলের বয়স যখন পঁচিশ, তখন তিনি প্রথম শাদি করেন চল্লিশ বছর বয়স্কা খাদিজার সহিত। রাসূলের মতন এত বড় মাপের মানুষ আমাদের সবমসময় ভালবাসারই শিক্ষা দেন। আমরাই এই ভালবাসা নিয়ে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করি।
আমি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললাম, প্রেমটা হলে কিভাবে?
সে ভাই অনেক বড় কাহিনী। মেয়ে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না, টাইপ। আগের স্ত্রী গত হয়েছে চার বছর হলো। আসলেই আমরা পুরুষেরা একাকীত্ব সহ্য করতে পারি না। মহিলারা তা পারে। স্বামী মরে গেলেও স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে সারাটাজীবন। শ্রী রামানুজানকে তো অবশ্যই চেনেন?
জি।
আমার অংকের শিক্ষক হবার সবচে’ বড় কারণ ইনিই। বেশ বড় মাপের মানুষ। তখনকার দিনে ব্রিটিশরা রামানুজানকে তো পাত্তাই দিতে চাইত না। রামানুজানের একটা সমস্যা ছিল। তিনি ঠুসঠাস অংক করে যেতে পারতেন, কিন্তু কাওকে বোঝাতে পারতেন না, অংকটা কিভাবে হলো। ব্রিটিশরা তার বইও ছাপতে অরাজি। কারণ তারা বিশদভাবে ব্যাখ্যা চায়। রামানুজান নিজে বুঝে বুঝে অংক করে যেতেন। কিন্তু কোনটা কোথা থেকে আসল তার ব্যাখ্যা ভালভাবে দিতে পারতেন না। ব্রিটিশরা তাকে পাত্তা না দিলে কি হবে, তার গণিতের সূত্র ধরেই কিন্তু আধুনিক “বিগ ব্যাঙ”। তিনি কিন্তু খুব কম বয়সে মারা যান। যক্ষ্মারোগে ভুগে। কিন্তু তার স্ত্রীর তখনও কাঁচা যৌবন। ইচ্ছে করলেই ভালো জায়গায় শাদি করে সংসারী হতে পারতেন। তবুও তিনি শাদি না করে বাকি জীবনটা রামানুজানকে ভেবে ভেবে কাটিয়ে দিয়েছেন। নারী জাতির মাহাত্ম্যকথা বলে বোঝানো অন্যায়। এঁদের কথা বলতে গেলে কাগজ, কলম ফুরিয়ে যাবে। এঁরা খুবই ভালবাসাময়ী, তবে গাধী টাইপের।

আমি সাবিলার মায়ের সামনে বসে আছি। আমাকে খুব ভালো নাস্তা করানো হয়েছে। সাবিলা বাইরে গেছে। আসতে বেশীক্ষণ লাগবে না। আমি আঙুর খাচ্ছি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আন্টি আমার সাথে শলাপরামর্শ সেরে ফেলেছেন। আংকেল রুমে আসামাত্রই চুপ করে আমার দিকে ফিরে ভদ্রমহিলা মিষ্টি করে হাসলেন। আংকেল মহিন সাহেব আমার সামনে পত্রিকা নিয়ে বসলেন। আমি সালাম দিলাম না। খাদ্য গ্রহণের সময় সালাম দিতে নবীজির নিষেধ আছে। মহিন সাহেব হাসিমুখে বললেন, তোমার নাম কি ইমু?
জি।
কি করো তুমি?
জি লেখালেখি।
তার মুখ থেকে হঠাৎ-ই হাসিটা উধাও হয়ে গেল। তিনি হতভম্ব মুখে আমার দিকে তাকালেন। আমি লেখক হয়ে তার মেয়ের স্বামী হতে এসে যে বড় ভুল করে ফেলেছি, তা তার মুখ দ্যাখেই বোঝা যাচ্ছে। মহিন সাহেব প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি লেখক?
জি।
তুমি কি ভেবেছো, লেখকদের সাথে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দিব?
এই বলেই তিনি আমার চোখে চোখ রেখে দাঁতমুখ কুঁচকালেন। আন্টির কাছ থেকে সাপোর্ট পাবার আশায় আন্টির দিকে তাকিয়ে বললেন, মিরা, তুমি দ্যাখি ওকে কিছু বলছো না! ছেলে লেখক হয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়! তার সাহস এত বড় হয় কিভাবে? ফকিরের বাচ্চা লেখক কোথাকার! লেখালেখি করে!
আন্টির কাছ থেকে সাপোর্ট নিতে গিয়েই মহিন সাহেব ভুলটা করলেন। স্ত্রী দাঁতমুখ কুঁচকে বললেন, বেশ করে, লেখালেখিই তো করে! অন্তত পাশের বাসার ভাবিদের ব্লাউজ তো আর চুরি করে না।
হঠাৎ-ই মহিন সাহেবের চোখ আমার চোখ থেকে সরে গেল। তার চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে বিড়ালের মতো নীল হয়ে গেল। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে একটা আঙুর মুখে ঢুকিয়ে আরেকটা আঙুর মহিন সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম, খাবেন?
মহিন সাহেব শেষবারের মতন আমার চোখের দিকে পূর্বের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল চাউনিতে রাগ প্রকাশ করে বিড়বিড় করে অস্পষ্ট ভাষায় কি যেন বলে চলে গেলেন। আন্টি আবার বত্রিশটা দাঁত বের করে ডায়াবেটিস বাড়িয়ে দেবার মতো মিষ্টি করে হেসে শলাপরামর্শ চালানো শুরু করলেন আমার সাথে। আমি ভীষণ আনন্দিত হলাম। মহিন সাহেব এখন যা করলেন, তার শাস্তি দেবার ইচ্ছা জেগেছিল তখনই। এখন আন্টি যেভাবে সায়েস্তা করতে পরামর্শ দিলেন এটা আমার বেশ মনে ধরেছে। মহিন সাহেবকে জবর শাস্তির বুদ্ধিটা আন্টি ছাড়া আর কারইবা মাথায় আসবে…?
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *