লেখকের প্রেম ৬ষ্ঠ পর্ব

প্রেমিকার বাবা পাশের বাসার ভাবিদের ব্লাউজ চুরি করেন। এই অত্যাচার থেকে বাঁচতে প্রেমিকার মায়ের মতন দাজ্জাল মহিলাটাও আমার ভালো বন্ধু হয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়। তার মতন কিপটে মানুষটা আমাকে পাঁচ হাজার টাকাও দিয়েছেন। তিনি কেমন কিপটে তা সাবিলার মুখ থেকেই শুনেছি। তিনি নাকি আদা, রসুন বাটার পর হাতে লেগে থাকা আদা, রসুনের অবিশিষ্টাংশ ধুয়ে না ফেলে হাতসুদ্ধই চুলোর উপর থাকা প্যানের উপর কুসুমগরম তেলের মধ্যে চুবিয়ে দেন। এই ভদ্রমহিলাকে এতদিন খারাপ ভেবে আসা আমার অনুচিত হয়েছে। তার আসলে একটা দয়ার শরীর আছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। তাছাড়া তিনি তার স্বামীকে ভালবাসেন, আর বেচারার কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় না করার তাগিদে তিনি যদি সামান্য কিপটে হোন, তবে তাকে ‘কিপটেমি’ না বলে ভালবাসার ব্যতিক্রম উদাহরণ -হিশেবে দাঁড় করানো যেতে পারে। ভদ্রমহিলা আমাকে আরও পাঁচ হাজার টাকা দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেটা কাজ শেষ হবার পর। কাজটা এখনও আমার মাথায় ঘুরছে। মহিলারই বুদ্ধি।

রেল স্টেশনে বসে আছি। আন্টি যে বুদ্ধিটা দিয়েছিলেন, সেটা নিয়েই ভাবছি। আর সামনে বসে থাকা একটা পাগল মেয়েকে দ্যাখছি। পাগল হলে কি হবে, তার জামাকাপড় যথেষ্টই পরিষ্কার। এমন স্মার্ট পাগল সচরাচর দ্যাখা পাওয়া দুষ্কর। খুব সম্ভব কোনও অর্গানাইজেশন থেকে ভালো কিছু কাপড় পেয়েছে। সে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আমার হাতে কোনও খাবার নেই। একটা সিগারেট আছে শুধু। পাগলকে তা দেয়া যাবে না। সে এটা চিবিয়ে খেয়ে বিপদে পড়বে। পকেটে টাকা থাকলে তাকে কিছু খাওয়ানো যেত। আমার পকেটে মানিব্যাগ নেই। তবে সেদিন ভালো টাকা ইনকাম হয়েছে। আমি এখন পাঁচ হাজার টাকার মালিক। সেই খুশিতে সিরাজ সাহেবের বালিকা স্ত্রীকে একটা নীল শাড়ি কিনে দিয়েছি। মেয়েটার চোখে জল চলে এসেছিল। সিরাজ সাহেব হতভম্ব মুখে তার স্ত্রীর উচ্ছ্বাস দ্যাখেছিলেন। আমার খুব ভাল লেগেছিল।
পাগলটা আমার দিকে তাকিয়ে দুই আঙুল দিয়ে নিজ কপালে দুবার আলতো করে ঘষা দিল। এটা তার বদভ্যাস না আমাকে তার ভাল লাগার নিদর্শন হিশেবে দিয়েছে, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। খুব সম্ভব বদভ্যাস, আমাকে ভাল লাগার কোনও কারণ নেই। বর্তমানে সব ছেড়েছুঁড়ে লেখক হবার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমি আত্মহত্যা করেছিলাম বলেই হয়তো লেখক হবার সিদ্ধান্ত নিই। সবার আত্মহত্যা করার সাহস নেই। দরকার নেই বলেই হয়তো-বা। ‘কি বুঝলেন ভাই?’
আমি পাশ ফিরে তাকালাম। একজন ভদ্রলোক পত্রিকা হাতে বসে আছেন। পত্রিকার দিকে তাকিয়েই তিনি গম্ভীর গলায় প্রশ্নটা করেছেন। পাগল দ্যাখার মধ্যে হয়তো তিনি যৌক্তিক কোনও কিছু খুঁজে পান নি। আমি স্মিত হেসে বললাম, পাগলীটাকে দ্যাখছি।
রোজ রোজ কত মানুষই তো তাকে দ্যাখে, কিন্তু সাহস করে তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার কথা কেও ভাবে না। পাগলটাও একটা জিনিশ বটে।
কি জিনিশ?
তিনি পত্রিকা থেকে চোখ কপালে তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওমা! আপনি জানেন না, পাগলটা কি করে?
কি করে?
নাচে। প্রতিরাতে নাচে। তখন আমোদী পাবলিক গান ছেড়ে দেয়। পাগলটা জান-প্রাণ দিয়ে নাচে। নাচতে নাচতে পড়েও যায়। কেও কেও এসে উঠিয়েও দেয় বটে, তবে পাগলটার স্বার্থে না, নিজেদেরই স্বার্থে। পাগলটাকে তুলে কড়া গলায় বলে, নাচ নাচ। পাগলটাও জান-প্রাণ দিয়ে নাচে। বড়ই নিষ্ঠুর মানুষগুলো!
ব্যাপারটা খুব বেদনাব্যঞ্জক। আমি পাগলীটার দিকে তাকিয়ে আছি। তার জন্য কিছু করতে পারলে ভাল লাগত। পাশে বসা ভদ্রলোকটা উঠে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আজ উনিশে মার্চ। এইদিনটা আমার বিশেষভাবে মনে থাকে। এইদিন আমি ভবঘুরে হয়ে দারুণ এক যাত্রা শুরু করেছিলাম। প্রথমে গিয়েছিলাম লালন সাঁইজির দরবারে। বাবার দরবারে মুরিদ হবার খায়েশ ছিল। বাস যখন রাজবাড়িতে, ঠিক তখনিই সুপ্তিকা ফোন করল। অনেকদিন পর ফোন করল। তার নাকি বাসায় ফোন ধরতে এবং করতে ঝামেলা আছে। সুপ্তিকা আমার তেমন কেও নয়, আমার লেখা তার ভালো লাগে, সেখান থেকেই পরিচয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে… না বন্ধুই। খুবই সিরিয়াস মেয়ে। অনেক বেশী বাস্তববাদী। আমার থেকে ক্লাসে একবছরের ছোট, কিন্তু বয়সে দুদিনের বড়। বেশীরভাগ সময়েই ডিপ্রেশনে ভোগে। তার কষ্টের কথাগুলো আমার সাথে শেয়ার করে। আমি খুশি হই তার খুশি দ্যাখে। তার অনেকদিনের ইচ্ছে একটা “ডিপ্রেশন গ্রুপ” খোলার। যেখানে মানসিকভাবে হতাশদের ভালো চিকিৎসা হবে। তার আসল নামটা আমি বলব না, আমিই তার নাম সুপ্তিকা দিয়েছি। কেন দিয়েছি, তাও এক বিশাল কাহিনী, কিন্তু তাকে কখনই তা বলা হয় নি।
কুষ্টিয়া পৌঁছার আগে তার সাথে ফোনে কথা হলেও আমি তাকে কুষ্টিয়া আসার ব্যাপারটি গোপন রাখি। শুধু বত্রিশটা দাঁত বের করে বলেছি, বাসা থেকে পালিয়ে গেছি। সে ছয়শেরও বেশী প্রশ্নবাণে আমাকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। আমি প্রতিত্তরে শুধু বলেছিলাম, বাসায় মন টিকছে না, তাই গৃহ পলায়ন।
কুষ্টিয়া এসে লালন বাবার দরবারে এক সাঁইজির আশ্রয়ে রাতে ঘুমানোর মহাসুযোগ হয়। মেয়েটা রাত এগারোটায় ফোন দিয়ে ভাঙা গলায় বলল, তুমি কোথায়?
আমি স্বাভাবিক ভাবে হেসে হেসে বললাম, আমি কুষ্টিয়াতে।
আমি জানি তো।
আমি খুব অবাক হলাম। ব্যাপারটা তার কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। ‘কিভাবে জানো?’
মনে হলো তাই। কোথায় তুমি?
আমি বিজয়ের হাসি হেসে বললাম, লালন বাবার দরবারে। এক সাঁইজির কাছে আছি। ভীষণ ভালো মানুষ। কথা বলবে তার সাথে? ফোন দিব তাকে?
সুপ্তিকা ফোন রেখে দিল। আমি সাঁইজির দিকে তাকালাম। তিনি দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু আগে তিনি নারীর শরীর নিয়ে বেশ মজার মজার কথা বলেছিলেন। শ্রোতা আমি একা নই। আমার সাথে আমার সমবয়সী আরও দুটা ছেলে আছে। তারাও আমারই মতন পর্যটক। আমরা সবাই সাঁইজির কথায় মজা পাচ্ছি। অডিটোরিয়ামে আমরা সবাই বিছানা পেতেছি। বিছানা বলতে ফ্লোরের উপর কাঁথা। অনেক সাঁইজি, মহিলা সাঁইজি শুয়ে আছেন। কেও আবার মনের সুখে তামাক ধ্বংস করছেন। আমি শুয়ে পড়লাম ব্যাগটাকে মাথার নিচে রেখে। ফোন তুলে দ্যাখি সুপ্তিকার আবেগঘন মেসেজ। সে লিখেছে, ইমু, তুমি এমনটা করলে কেন? বাসা ছেড়ে পালিয়েছো কেন? বাসার ঝগড়া মিটমাট করতে পারো নি? এখন তুমি কি খাবা? কোথায় ঘুমাবা? কেন করলে এমনটা? আচ্ছা বাসা থেকে পালিয়ে ঢাকাতেই কোনও বন্ধুর বাসায় থাকতে, লালনের দরবারে কেন এসেছো? আমি তোমাকে কত বারণ করেছি না, জায়গাটা ভাল না ভাল না। তুমি তো শুনলেই না। কেন করলে এমনটা? এখন তুমি কি করবে? এত পাগলামি কেন করো? এত ভবঘুরে না হলে বাঁচা যায় না? তুমি না বলেছিলে কোচিঙে ক্লাস করাবে? কই তোমার কোচিঙ? সেটা ফেলে দরবারে কি করো? আমার তখন খুব কান্না পাচ্ছিল, তাই ফোন রেখে দিয়েছিলাম।
আমি মেসেজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। যাত্রী ছাউনিতেও আমি ঘুমিয়েছি। সুতরাং এই অডিটোরিয়াম আমার কাছে ৩০০ টাকার দামী হোটেল। লালনের দরবার ভাল না -এটা সুপ্তিকা ভুল বলেছে। এখানে না এলে সাঁইজিকে পেতাম না। তিনি খুবই জ্ঞানী এবং রসিক। মেয়েদের এমন কিছু গোপন অঙ্গের নাম তিনি জানেন, স্বয়ং মেয়েরাও জানে না, তাদের এমন কোনও গোপন অঙ্গ সৃষ্ট আছে। বিপুলা এই শরীরের কতটুকু জানি…? ঘুম থেকে উঠলাম সকাল নটায়। ভাল একটা ঘুম হয়েছে। চোখ মেলে দ্যাখি সাঁইজি তামাক টানছেন। আমাকে দ্যাখেই খুব মিষ্টি করে হাসলেন। শাদা পাঞ্জাবী, শাদা লুঙ্গি, শাদা দাড়ি আর শাদা হাসি। কি মধুর আহা! আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, নানা, আপনি যখন উঠেছিলেন, আমাকে ডাকলেন না কেন?
তিনি ধোঁয়া ছেড়ে হাসতে হাসতে বললেন, মনের মানুষকে ডাকতে নেই রে।
কেন নানা?
তিনি উত্তর না দিয়ে গান ধরলেন, মিলন হবে কত দিনে, ও মিলন হবে কতদিনে,
আমার মনের মানুষেরও সনে…
আমি ফোন হাতে নিয়ে দ্যাখি সুপ্তিকার পরপর অনেকগুলো মেসেজ। যেমন- ইমু, রাতে কি খেয়েছিলে? এই ভুলটা কেন করলে? বাসা থেকে না পালালে হতো না? সাঁইজিরা খুব খারাপ মানুষ। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হলে তুমি মরবা। জানি না, আমার ঠিক এই মুহূর্তে তোমার খুব কাছে থাকতে ইচ্ছে করছে। বাসায় কি বলে তোমাকে আনব তাই ভাবছি। আচ্ছা এতগুলো মেসেজ দিলাম, তুমি কিছু বলছো না যে? তুমি কি ঘুমাচ্ছো? মনে হয় তুমি ঘুমাচ্ছো। আচ্ছা তুমি কোথায় ঘুমাচ্ছো?
আমি বিরক্ত হলাম। মেয়ে মানুষের বুদ্ধি থাকলে তারা কখনওই সাঁইজির বিপক্ষে যেতে পারত না। এরা খুবই উদার। গতকাল আমাকে তাদের পাশে রেখেছেন। বিশেষ করে আমি এখন যাকে ‘নানা’ বলে ডাকছি, তিনি তো তার কাঁথাটাই দিয়ে আমাকে জড়িয়ে দিলেন। কি দয়ার শরীর! এমন ভালবাসা আমি লালন বাবার দরবার ছাড়া আর কোথায় পাব…? এই মুহূর্তে আমি ঠিক করে ফেললাম, বাকি জীবনটা বাবার মুরিদ হয়ে কাটাবো। সকালের প্রথম সিগারেটে আগুন দেয়ামাত্রই সাঁইজি বললেন, চল, সকালের নাস্তা করে আসি।
আমি উঠে পড়লাম। গতরাতে পরিচিত হওয়া দুই বন্ধুর দিকে হাসিমুখে তাকালাম। সাঁইজি একটু সামনে যাওয়া মাত্রই তাদের একজন আমার কানে ফিসফাস করে বলল, খানকির পোলারা ভাইঙা খায়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে?
মানে বোঝো না! তারা তোমার, আমার, আমাদের মতন যারাই এখানে আসবে; তাদের টাকায় প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকাল, রাতের খাওয়া সাথে দুই প্যাকেট ডার্বি, আর চা খাবে। পারতপক্ষে কনডমও তোমার টাকাতেই কিনবে। সাঁইজির মারে***! শালা সারাদিন খাই খাই করে। তোর মুখে আমি মুতে দিই।
(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *