লেখকের প্রেম ৭ম পর্ব

আমি হতাশ মুখে সাধুবাবার পেছন পেছন আসছি। সঙ্গী দুজন অচেনা বন্ধু, একজন শান্ত, আরেকজন তাপস। দুজনেই খুব ভাল।
আমি এত কষ্ট করে টিউশনির টাকা জমিয়ে লালন বাবার দরবারে এসে যদি তাঁর খাদ্যলোভী মুরিদদের পেছনে খরচ করতে হয়, তবে আমারও এই মুহূর্তে লালন হয়ে যাওয়া উচিত।
বাবার সাথে খেতে বসা হয়েছে। তিনি মাংস বা মাছ খান না বলে আমাদের তিনজনের ঠোঁটে বিস্তৃত হাসি ফোটানোর জন্য মনেমনে তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছি। বাবা বেশী খেতে পারেন না। দুটা পরোটা আর ভাজি। সাথে সামান্য খিচুড়ি। তবে খিচুড়ি খেলে মাংস-তে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। খাওয়া শেষে একটা রঙ চা আর দুটা সিগারেট। দুপুরবেলা, রাতেও ভাত। সাথে এমনই সামান্য খাওয়া। বিকেলে সিঙারা, সমুসার বদলে রোল বা পেটিস বা বার্গার দিলে তিনি খুশি হন। আর হাসিমুখে শুনিয়ে দেন, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি…
মুরিদ বাবাকে আমরা নানা ডাকি। কিন্তু আমি তাকে বাবা বলেই ভীষণ স্বস্তি পাই। অডিটোরিয়ামই এখন আমাদের বাসস্থান। মোবাইল চার্জ দেয়ার সময়েও পাশে বসে থাকা লাগে। বাথরুম চাপলেও চলে যাওয়া যায় না। মোবাইল সরিয়ে বাথরুমে গিয়ে দুই মিনিটের মধ্যে ফিরে এলেও দ্যাখা যাবে, অইখানে আরেকটা মোবাইল চার্জ দেয়া হয়ে গেছে। বাবা এক্ষেত্রে আমাদের ভীষণ হেল্প করেন। তার দায়িত্বে রেখে গেলে কোনও জিনিশ চুরি হবার ভয় নেই। বিকেলে সামান্য হাঁটাহাঁটি শেষে রাত হলেই অডিটোরিয়ামে গানের আসর বসে। আমরা হয়ে যাই মুগ্ধ শ্রোতা। গান শেষ হলে বাবা আমাদের সাথে নারীর শরীর সংক্রান্ত জটিল কিন্তু সরস মজা করেন। কি যে ভাল লাগে তখন! তার প্রায় সবকথাই ‘চ’ বর্গীয়। আগে এই মাজারে গাঁজার আসর বসতো। এখন জেলা প্রশাসক তা বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে মেলার সময় ঠিকই বসে। তখন প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ চলে আসেন এই মেলাতে। বিদেশ থেকেও লালন ভক্ত ছুটে আসেন।
একটু আগে বাইরে থেকে চা খেয়ে আসা হয়েছে। এখন সিগারেট খাওয়া চলছে। আমি তৃতীয় সিগারেট ধরানোমাত্রই একজন মহিলা এসে বাবার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিল। মহিলার বয়স হলেও চেহারায় এখনও রূপ ভাসে। এই ধরনের মহিলাদের দ্যাখলেই কেমন যেন মায়া হয়, আপন আপন লাগে।মনের ভেতর থেকেই আপনাআপনিই “মা” ডাকটা ভেসে আসে। এমনভাবে ডাকতে ইচ্ছে হয়, যেন আমি মা হারা সন্তান। মহিলা সিগারেটে প্রথম ধোঁয়া ছেড়ে চলে যাবার আগে আমি খুবই বিনীতভাবে ডাকলাম, মা!
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ভুবনমোহিনী হাসি দিলেন। এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন। আমি যখন তার আদর খাচ্ছি, ঠিক এই অসময়ে সুপ্তিকা ফোন দিল। আমার সাথে সাথে এই নূতন মা-টাও ফোনকলে প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন। আমি ফোন কেটে দিলাম। সুপ্তিকা বারবার একই কথা বলে, ইমু, বাসায় চলে যাও প্লিজ। বাবার সাথে ঝগড়া মিটিয়ে ফেল। কিন্তু আমার মনে হয়, লালনের এই দরবারটাই তো আমার বাসা। এই যে পাশে বসে থাকা সাঁইজি বিড়ি টানছেন, তিনিই তো আমার বাবা, আর আমার মাথায় পরম আদরে হাত বোলানো মহিলাটা আমার মা। এতসব ভালবাসা ফেলে আমি কোথায় যাব? কে রাখবে আমায়? বাসায় থাকলে সব থাকবে, বিছানা-বালিশ, সোফা, চেয়ার, টেবিল; সব থাকবে। কিন্তু এই ভালবাসাটা কি থাকবে…? মেয়ে মানুষের বুদ্ধি দিনদিন শূন্যের কোটায় নেমে আসছে। আশংকাজনক ভাবে এভাবে আমাদের অর্ধ জনসংখ্যা মেধাশূন্য হয়ে গেলে আমরা কি কি বিপদে পতিত হব, তা নিয়ে আমি নাতিদীর্ঘ এক থিসিস লিখে ফেললাম। লেখার মাধ্যম চক এবং দেয়াল। মুরিদ বাবা গতরাতে একটা খাঁটি কথা বলেছেন, অসুস্থ হলে যেমন পাইপ নাকের মধ্যে ঢুকিয়ে খাবার দেয়া হয়, তেমনি নারীর মস্তিষ্কের ভেতরেও পাইপ ঢোকানো এই অসময়ে আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমি যাকে মা বলে ডেকেছিলাম, তিনি মাথায় হাত বোলানোর পর বেশ কিছুক্ষণ হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমিও প্রতিত্তরে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিলাম। একটা মহিলা এত সুন্দর করে হাসতে পারে, না দ্যাখলে একজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যেত। মহিলার সিগারেট খাওয়াও শেষ, কিন্তু তিনি আমার দিকে এখনও হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। পাশ থেকে তাপস ফিসফিস করে বলল, খুব আদর করে আম্মু বলেছো না! দাও, এবার তোমার আম্মুকে ১০ টাকা দিয়ে দাও।
আমি বিধ্বস্তমুখে তাপসের দিকে তাকিয়ে বললাম, কি বললে ভাই?
তোমার আম্মু এতক্ষণ ধরে আদর করল, বেচারি কি মাগনা করেছে? দাও তাড়াতাড়ি! আর সবাইকে ধরে ধরে আম্মু, আব্বু ডাকবে না।
আমি মুখে ফ্যাকাসে হাসি এনে মহিলাকে বিশ টাকা দিয়ে দিলাম। পকেটে টাকা ভাংতি না থাকায় ভালো বিপদে পড়া গেল। মহিলা খুশি হয়ে আরও কিছুক্ষণ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে শব্দ করে একটা চুমু খেল। ওপাশের একজন বুড়া মানুষ মাত্রই ঘুমাচ্ছিলেন। তিনিও এই চুমুর শব্দে জেগে উঠে কয়েকবার খুকখুক করে কেশে নিলেন। মহিলা এবার দ্বিতীয় চুমু খেয়ে খুবই নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে মিষ্টি করে বলল, বাবা, মা বলে তুমি আমার চোখে জল এনে দিয়েছো। কেন জানি আমার এখন খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাকে একটা সিগারেট দিবে?
মহিলা চলে যাওয়ার পর দ্যাখলাম, সুপ্তিকা অনেকগুলো ফোন দিয়েছে। আমার ফোনে ব্যালেন্স নেই, থাকে না কখনওই। আমি আবার বাবার কথায় মনোযোগী হলাম। বাবা হিহি করে হাসতে হাসতে বললেন, বল তো তোরা, সময় গেলে সাধন হবে না!
দিন থাকিতে দিনের সাধন কেন করলে না?
সময় গেলে সাধন হবে না… -বলতে সাঁইজি কি বুঝিয়েছেন?
তাপস কিছুক্ষণ বিচক্ষণের মতন ভেবে বলল, সময় নষ্ট না করা। দিনের কাজ দিনেই শেষ করা। এই তো!
বাবা খুব মধুর করে হাসলেন। হেসে হেসে বেশ মজা পাচ্ছেন, এমন ভঙ্গীতে বললেন, না রে বোকা! সাঁইজি বুঝিয়েছিলেন অন্য ব্যাপার। এটা আসলে নারীকুল নিয়েই লেখা। নারীরা যৌবনে খুবই রূপবতী থাকে। বয়স বেড়ে গেলে কি থাকে রে বেটা?
আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম, না না, একেবারে না।
বাবা বিড়িতে টান দিয়ে দুষ্টভাবে চিরযৌবনা হাসি মুখে এনে বললেন, মেয়েরা যাতে বয়স থাকতে চো* (সেক্স) করে, তাই বোঝানো হয়েছে রে পাগলা! বয়স বেড়ে গেলে যতই করো, লাভ নাই। মজা নাই, তৃপ্তিও নাই। করতে হবে কম বয়সে, কচি বয়সে। নইলে সাধন হবে না রে পাগলা।
আমার খুব ভালো লাগল। বুড়ো একজন মানুষ যদি এত মজা করে কথা বলতে পারেন, তখন অবাক হলেও বিশ্বাস করতেই হয়, বন্ধুত্ব বয়স দিয়ে বিচার করা বোকামি। গতরাতেও বাবা বলেছেন, কচি মেয়ের কালেকশন আছে, লাগবে নিকি (নাকি) ? বাকি বন্ধু দুটা না বলায় আমিও রাজি হই নি।
সুপ্তিকা আমাকে ফোন দিল। আমি প্রচণ্ড বিরক্তি চেপে হাসিমুখে বললাম, কি খবর?
খুব খারাপ খবর। কোথায় তুমি?
বাবার পদধূলির নিচে।
তুমি এখনও বের হও নি ওখান থেকে? এখনও বাসায় যাও নি?
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি তো বাসাতেই আছি। এখানে সাঁইজিরা আছেন, মায়েরা আছেন। রাতে কান্না পেলে গুরুর কবরের পাশে গিয়ে বসি। মন ভালো হয়ে যায়। আমি এখান ছেড়ে কোথায় যাব?
সুপ্তিকা বেশ কিছুক্ষণ কোনও কথা বলল না। আমার সাথে আর কোনও কথা বলা উচিত কিনা তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। মোবাইলে টাকা উড়ে উড়ে আসে না। এর অপব্যবহার করার চাইতে ব্যবহার করা ভালো। বেশ অনেকক্ষণ পর সুপ্তিকা বলল, ইমু।
জি?
তোমাকে আমি আমার বাসায় নিয়ে আসব। বাবার সাথে থাকতে তোমার আপত্তি থাকলে আমার সাথে থাকবে। আমিই তোমার ঢাকার বন্ধুদের সাথে তোমার মেস এবং জবের ব্যাপারে কথা বলব। আমি এক ঘণ্টার মধ্যেই মাজারের সামনে আসছি, ভেতরে ঢুকব না ভুলেও। ফোন দিলেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসবে।
আমি খুব করে হেসে বললাম, কক্ষনো না! দরকার হয়তো লালনের মাটি কামড়ে বসে থাকব। তবুও এখান থেকে একচুলও নড়ব না। তুমি আমার জন্য এতকিছু ভেবেছো, তারজন্য ভালবাসা অহর্নিশ। আচ্ছা শোনো, তুমি কি ইপিলইপিল গাছের বিচির মালা গলায় দিবে? এখানে মায়েরা এটা গলায় দেন, এখন আমার গলায়েও একটা আছে। তোমার জন্য একটা শাদা শাড়িও কিনব। তারপর শাদা শাড়ি, ইপিলইপিল গাছের বিচির মালা, গায়ের সারা রাজ্যের বালি, কম আহার গ্রহণ, আর সম্মানিত সিগারেট খেলে কিন্তু তুমিও মহিলা সাঁইজি হতে পারবে। হবে? তারপর আমরা সারাদিন একসাথে গাইব, সত্য কাজে কেও নয় রাজি, সবাই শুধু তা না না না না, জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা! সুপ্তিকা, তুমিই কিন্তু একদিন বলেছিলে, আমার সাথে একদিন খুব করে ঘুরতে তোমার ইচ্ছে হয়। চলে আসো না প্লিজ। বেশী কিছু তো লাগছে না, শুধু একটু সাহস করে যেভাবে আছো, ঠিক সেভাবেই চলে আসো। হেলাল হাফিজের ভাষায়, “আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো,
ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি,
লাল শাড়িটা তোমার, পরে এসো।” আচ্ছা সুপ্তিকা, তোমার কি লাল শাড়ি আছে?
সুপ্তিকা ফোন রেখে দিল। আমি কিছুটা বিরক্ত এবং অবাক হলাম। হাসিও পেল। তাহলে এতবার ফোন দেবার মানে কি, যদি কথাই না শুনতে চায়? কিছু কিছু মেয়ের জন্মই হয় মানুষকে আজীবন বিনে পয়সায় উপদেশ দেবার জন্য। সুপ্তিকাও এই শ্রেণীর প্রাণী, তাকে মানুষী বলা যায় না।

বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, কিরে রাত হলো কত! খাবি না বুঝি কিছু?
বাবার ক্ষিধে পেয়েছে বুঝতে পেরে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম। আমি একটা সিগারেট ঠোঁট লাগিয়েছি মাত্র, ঠিক তখনি বাবা আমার পাশে এসে বললেন, বুঝলি রে, মানুষের গান গেয়ে গেয়ে লালন ফকির মরলেন, কে দিল তার দাম? আজকাল এত অমানুষ চারপাশে! খুব কান্না পায় এসব দ্যাখলে।
আমি ভাবুক গলায় বললাম, দাম দিলাম আপনার একথায়।
দোকানদার-রা বেচাকেনা করবে, কিন্তু সততা না রেখেই? দুধের ভেতর পানি। সত্য কাজে কেও নয় রাজি…
আমি খুবই আহত হলাম। সত্যের পূজারি লালন সাঁইজি মারা গেছেন। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠা হলো কই! এখানে যারা তাঁর ধ্যানে মুরিদ হয়েছেন, তারা সত্য প্রচার করুক, এই তো চাওয়া আমাদের।
বাবা একটু বিষণ্ন গলায় বললেন, শোন নানাভাই, একটা মুদি দোকানদার। বানচোতটা আমার থেকে আশি টাকা পায়। একটু দিয়ে দে না আমার লক্ষ্মী নানাভাইটা…!
চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *