কালো_জাদু (1ম পর্ব)

নিজের গলায় নিজেই ছুরি চালাচ্ছে শুভ।হ্যাঁ এমনটিই দেখছে শুভ।আয়নার সামনে সে তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখছে।শুধু পার্থক্য হল আয়নায় থাকা শুভর হাতে ধারাল ছুরি,,আর আয়নার সামনে দাড়িয়ে থাকা শুভ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে।শুভর একটা বাজে স্বভাব আছে,,রাতে ঘুম থেকে উঠলে তার অনেক ক্ষুধা পায়।সেই সুবাদে রাতে ঘুম থেকে উঠার পর ওয়াশরুম এর আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির বদলে এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে সে।মুহুর্তের মধ্যে আঁতকে উঠে শুভ।সাথে সাথে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজেদের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় তার বড়ো বোনের চিতকার শুনতে পায় সে।
-কি হয়েছে আপু?
-কিছুনা,,দুঃস্বপ্ন ছিল।দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার।তুই ঘুমিয়ে পর।
-ঠিক আছে।
শায়লা পুরো ঘামে ভিজে গেছে।শুভর বোনের এই পরিস্থিতি তে তাকে শুভ আর কিছু না জানানো টাই ভালো মনে করল।তবে প্রতিদিনের এসব ভয়ানক কর্মকাণ্ড তাকে অনেক চিন্তিত করে তুলল।এসব ভাবতে ভাবতে শুভ কখন যে ঘুমিয়ে পরল তা বুঝতে পারল না।
শুভ দের ফ্যামিলি তে সদস্য সংখ্যা ৫ জন।শুভ,তার বোন শায়লা,শুভর বাবা (কামাল আহমেদ), শুভর মা (মিসেস শিরিন সুলতানা),এবং শুভর দাদী।
শুভ দশম শ্রেণী তে পড়ে এবং শায়লা অনার্স ১ বর্ষের ছাত্রী। 
গত কয়েকদিন ধরেই শুভ ও তার বোন কিছু ভয়ানক কর্মকাণ্ডের সম্মুখীন হচ্ছে।যদিও দুজনের কেউই বিষয় টি অন্য কাওকে জানায় নি।নিজের চোখের ভুল না অন্য বাহানায় বিষয় গুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তারা।ঘটনার সূত্রপাত হয় আরো ৫ দিন আগে থেকে।যখন সে তাদের বাসায় হঠাৎই একটি অপরিচিত ছায়ামূর্তির দেখা পায়।এরপর থেকে ঘটনা ক্রমশই বেড়েই চলেছে। 
সেদিন বিকেলে শায়লা ঘুমিয়ে ছিল,,তার বাবা-মা দুজন ই চাকরীজীবি। তার দাদী অসুস্থ হওয়ায় সারাদিন শুয়ে থাকেন।সেদিন সবাই বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছিলেন।শায়লা কলেজে থাকার কারনে যেতে পারেনি।অনেক ক্লান্ত থাকায় বিকেলে পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে পরেছিল।হঠাৎ শায়লা শুনতে পায় কলিংবেলের আওয়াজ। ঘুম চোখে শায়লা উঠে গেইট খুলে দেখে শুভ এসেছে।
-কিরে কই গেছিলি?
-খেলতে গিয়েছিলাম আপু।ব্যাট নিতে ভুলে গিয়েছি।
-ওহ আচ্ছা।তাড়াতাড়ি ব্যাট নিয়ে দূর হো এখান থেকে।ঘুম ভাঙিয়ে দিলি অসময়ে। 
মুচকি হেসে শুভ বলে,, – আচ্ছা!!
এই বলে সে ব্যাট নিয়ে চলে যায়।এরপর গেইট লাগিয়ে দিয়ে শায়লা যেই না শুতে যাবে,,তখনই হঠাৎ তার মনে হল,,শুভ!!!!
ও তো বাবা-মার সাথে বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছে??তাহলে এটা কে ছিল যে মাত্র তার সামনে ছিল।একটি শীতল বাতাস তার ভয়ের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়ে গেল।আচ্ছা শুভর ব্যাট টা কোথায় আছে এটা দেখা যাক।
ভাবল শায়লা,,,,
ব্যাট টা ঠিক তার স্থানেই রয়েছে। তাহলে ঘুমের ঘোরে ভুলভাল দেখেছে সে??
এমনটিও হতে পারে যে ক্লান্ত থাকার কারনে এসব দেখছে সে।ইদানীং সে পড়াশোনার চাপে আছে অনেক।তাই হয়ত হ্যালুসিনেসনে ভুগছে সে।যদি সত্যি এমন কিছু হত তাহলে তো সবার সাথেই হতো। শুধু তার সাথে তো আর হবে না তাই না??
এসব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলো শায়লা।কিন্তু ঘুম আর আসল না তার চোখে। বেশ কিছুখন পরেই শুভ ও তার বাবা-মা চলে আসলেন বিয়ে বাড়ি থেকে।ঘটনা শায়লা কাওকে জানায়নি।ভেবেছিল এটা নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে।ঘটনাটি তার পরের রাতের।শুভ দের বাসায় ৩টি বেডরুম।১টি তে তার বাবা-মা থাকেন,,১টি তে শুভ থাকে।আর ১ টি তে শায়লা ও তার দাদী থাকেন।
রাত ২ঃ৪৭ মিনিট,,
শুভ তার অভ্যাসমত ঘুম থেকে উঠল।কিন্তু তার কেন যেনো মনে হল তার রুমে অন্য কেউ বসে আছে।নিশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।ঘুম থেকে ভাল ভাবে উঠে বসল বিছানায় শুভ।ভাল ভাবে দেখতে লাগল চারিপাশে। 
আররে,, ওটা শায়লা আপু না??
শুভর রুমের গেইটের পাশেই গুটিশুটি মেরে বসে আছে শায়লা।তার চেহারা বুঝা যাচ্ছে না।কারন তার চুল গুলো সে সামনে এনে রেখেছে।অর্থাৎ শায়লা তার সকল চুল মুখের সামনে করে বসে আছে।শুভ জামা দেখে চিনতে পারল তার বড়ো আপুকে।সে নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে গেল।ভাবল ঘুমের ঘোরে তার আপু তার ঘরে চলে এসেছে।
-এই আপু,,,উঠ!! যা তোর রুমে যা।আমার রুমে কি করছিস?? যা ভাগ!!
তার আপু নিশ্চুপ।
-কি হল??আর এভাবে বসে আছিস কেন?
আব্বুকে বলব কালকে??
এবারও কোন কথা বলল না শায়লা।এবার ভালই রাগ উঠল শুভর।সে শায়লার মাথায় একটা টোকা মেরে বলল -কিরে,,আপা?? 

-_-
এবার শায়লা মাথা উঁচু করে শুভর দিকে তাকাল।কিন্তু একি!!!!??
এটা তো শায়লা না!!বরং শায়লার মতই দেখতে এ এক অন্য মেয়ে!!তার চেহারা অনেক বিভৎস!!
মেয়েটার চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে!!তার চেহারা এর মাংস গলে গলে পড়ছে!!তার চোখের কোটর থেকে যেন আগুনের লাভা বের হচ্ছে!!শুভ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।বিকট এক চিৎকার দিয়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।তার জ্ঞান যখন ফিরল তখন সে তার রুমের মেঝেতেই শুয়ে আছে।তার মা ও তার বাবার সাথে তার দাদী এবং তার শায়লা আপু ও এসেছে।আপুকে দেখে সে যেন এক মুহুর্তের জন্য আবারও চমকে উঠল।তার মা তাকে জিজ্ঞেস করলঃ
-কি হয়েছিল রে শুভ??তুই এভাবে হঠাত অজ্ঞান হলি কিভাবে আর এখানেই বা কেন তুই?
এতগুলো প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দিবে সে এই মুহুর্তে সে বুঝে উঠতে পারল না।তবুও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে তার মা কে এবার এতদিন ধরে যা তার সাথে হচ্ছিল সেসব কিছু খুলে বলল। তার মা প্রথম প্রথম এসব অবিশ্বাস করতে থাকলে ও শায়লা যখন শুভর কথা শুনে নিজেও তার সাথে সংঘটিত ঘটনা গুলো বলল তখন এসব তাকে চিন্তিত করে তুলল। তার দাদী এসব শুনে শুধু এটুকুই বললেন “এঈডা কালা জাদু রে কামাল,,এঈডা জাদুটোনা।” 
কামাল সাহেব তার মা কে চুপ করিয়ে দিলেন এটা বলে যে,,, “”এসব কুসংস্কার এ আমি বিশ্বাস করিনা মা,,তুমি তো জানোই।এসব কিছু ওদের মনের ভুল।সারাদিন হরর মুভি দেখে দেখে এসব ছেলেমেয়ের মাথা একেবারেই গেছে বুঝলে??””
কামাল আহমেদ এতখন সব কথা শুনে নিজে কিছুটা চিন্তায় পড়লেও কাওকে বুঝতে দিলেন না।তিনি শুভ কে তাদের রুমে ঘুমোতে বললেন।পরেরদিন সকাল,,,
ভার্সিটি তে,,,
মনির-দেখো শায়লা তোমাকে আমি শেষবারের মতো বলছি,,আমার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাও।
শায়লা-তোমাকে আমি আর কতবার বলব যে আমি তোমাকে ভালবাসি না।আমাকে আরেকবার বিরক্ত করলে এবার তোমার বাসায় পুলিশ পাঠাব।
মনির-সেটা তোমার ইচ্ছা।আগেরবার তো তোমার বাবাকে পাঠিয়ে আমাকে ইচ্ছে মতো মার খাইয়েছ।এবার নাহয় পুলিশই পাঠাও।আজ শেষবারের জন্য দেখা করতে এসেছিলাম।হা হা হা। মানা করে দিলে।
বাই দা ওয়ে,,আপেল খাবে,,আপেল??
শায়লা কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে গেল।বাড়ি ফেরার জন্য বাসে উঠল।বাসে হঠাত সে লক্ষ্য করল তার পড়নের ওড়নার কিছু অংশ ছেঁড়া।এটা নিশ্চয় কোন ছেলে করেছে।বর্তমানে মেয়েদের ইভটিজিং এর জন্য অনেকেই মেয়েদের ওড়না ছিড়ে দেয়।আজ তার সাথে এমনটি প্রথম হল।এই ব্যাপার টি কে খুব সাধারন মনে করেই ভুলে গেল শায়লা।প্রতিরাতেঘুমাবার আগে শায়লা তার চুল আছড়িয়ে ঘুমায়।আজ ও তার ব্যাতিক্রম হল না।শায়লা চুল আছড়িয়ে চিরুনি থেকে তার চুল গুলো নিয়ে পেচিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলল।কিন্তু চুল ফেলে বিছানায় ঘুমাবার জন্য যেই না শায়লা যাবে ঠিক তখনই মনে হল যে বাইরে থেকে কেউ যেন অন্য দিকে ছুটে দৌড়ে গেল।শায়লা তৎক্ষণাত জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল।কিন্তু সে কাউকে দেখতে পেল না।সে ভাবল কোন কুকুর বা বিড়াল হবে।এটা ভেবে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
যেখানে ইদানীং শায়লা অনেক ভয়ানক স্বপ্ন দেখত সেখানে আজ সে অনেক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।শায়লা তার স্বপ্নে দেখল,,,
“তার দাদী এবং সে একটি রুমে বসে আছে এবং অনেক গল্প করছে।তার দাদী কে অনেকটাই সুস্থ মনে হচ্ছে।তারা হাসাহাসি করছে।এক পর্যায়ে তার দাদী তাকে বলছে—-
-এই শায়লা নে আপেল খা !!!
-নাহ দাদীমা আপেল খাবো না।
-নাহ তোকে খেতে হবে,,এই নে!!!
-আচ্ছা ঠিক আছে দাও!
এরপর সে আপেলটি খেলো।এবং তার দাদীকে বলল,, -দাদী এবার তুমি খাও!!
এবার তার দাদী মুচকি হেসে বলল,, 
-না রে!!ওই আপেলটি তোর জন্যই এতদিন ধরে রেখেছিলাম!!!
কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল শায়লার এবং ঘুম ভাঙতেই সে দেখল……..
চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *