স্থিরতার শেষে……২

“হ্যালো! আমার কথা শোন!”
“ফয়সাল তুমি আজকেই আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। আমি কিচ্ছু জানি না।”
“কিন্তু জান, আমার সামনে বিসিএস। তুমি জানো এটাই শেষ। দয়া করে…”
“রাখো তোমার দয়া! বছরের পর বছর বিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে ফ্যামিলির সাথে কী যুদ্ধ করতে হয়, ধারণা আছে? পাড়া প্রতিবেশী যখন কুৎসিত হাসি দেয় আমার দিকে, কেমন লাগে কোন ধারণা আছে? আমি আর পারছি না ফয়সাল। হয় বিয়ে করো, নাহলে ভুলে যাও আমার কথা।”
“নীরা!”
“বাংলা সিনেমার মতো চিল্লাবে না। লাইফ বাংলা সিনেমা না। এতো ভালোবাসলে ঠিকই আগের দুইবারেই বিসিএস পেয়ে যেতে।”
আমি নীরব।
“ঐ অকর্মা সাজিদের সাথে ঘুরো আরও! বিসিএস এতো সোজা?”
এবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গা শুরু করলো।
“চলো তো আঙ্কেলের টাকায়, টাকা কামাইয়ের কষ্ট কি বুঝবা?”
“টাকা আর মানুষ কামায় না, তাই না? বেশিদূর যাওয়ার দরকার নাই, তোমার ব্যাচমেটদেরই দেখো না!”
“ইউ নো হোয়াট? দা হেল উইথ ইউ। যাওগা বিয়ে করেই ফেলো।”
“তা তো বলবাই এখন! বিয়ে ছেলেরা যে জন্য করে তা তো ডান! হিজড়া কোথাকার! এত ইংলিশ মাড়াইয়া তো কিচ্ছু ফেলতে পারলি না…”
এই পর্যায়ে আমি ফোন রেখে দিলাম। আর সহ্য হচ্ছিলো না।
সহ্য কেন হচ্ছিলো না কেন, জানেন?
কারণ কথাগুলো সম্পূর্ন মিথ্যা না। অনেক কুৎসিত উপস্থাপন, কিন্তু মিথ্যা না। কেবল ঐ বিয়ে এড়ানোর অংশ বাদে। মেয়েটাকে বিয়ে করার নিয়ত আমার আছে। কিন্তু এই কপর্দকহীন অবস্থায় না। 
পাশ করেছি আজকে তিনবছর। এরপর টিউশনিই পেশা। নিয়োগ পরীক্ষা দেই, প্রিলিমিনারি টিকি, রিটেনে যেয়ে ধরা খাই। ব্যাটে বলে মিলছেই না। ম্যালা চেষ্টা করেছি। দুই দুইবার বিসিএস প্রিলি উত্তীর্ণ হয়েছি, ঐ একই কাহিনী। খুব একটা মেধাবী আমি নই। সারাদিন ঢাকা শহর চক্কর দেয়ার পর যতটুকু পড়তে পারি সেটা দিয়ে এর বেশি কিছু করতে পারছি না৷ টিউশনি ছেড়ে দিয়ে ঝাড়া পড়া দিবো, সে উপায়ও নেই। বাসায় টাকা পাঠানো লাগে। আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম। বাবা মারা গেছেন। 
এরওপর বেশ কয়েকদিন এই রিলেশনের টানপোড়ন লেগেই আছে। জ্বী, ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, মেয়েকে বাসা থেকে দেয়া হচ্ছে বিয়ের চাপ। এদিকে আমার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস, জব স্ট্যাটাস উভয় অবস্থাই ত্রাহিত্রাহি। প্রথম দিকে আমার গানের গলা শুনে মেয়েটা বিমোহিত হতো। এখন আমার কন্ঠই তার কাছে বিষ। তিন জন্মদিনে তিনটা কসমেটিকের কৌটা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি নি। এদিকে নিজেকে উত্তোলন করে বিয়েও করতে পারছি না৷ রিলেশনে ঝগড়া তাই লেগেই থাকে। আজকে চরমে পৌঁছালো।
সস্তার সিম্ফোনি ফোনটার ওয়ালপেপারে আবার ম্যাডামেরই ছবি। দেখে মন আরও তিক্ত হয়ে গেলো। ওয়ালপেপার চেঞ্জ করতে যেয়ে নবাবজাদা মোবাইল ঐখানেই হ্যাং করলো। ব্যাটারি খুলে লাগাবার পর দেখি ওয়ালপেপার পরিবর্তনই হয় নি। কপাল!
সে যাক। আমার সহ অকালকুষ্মাণ্ড জনাব সাজিদ ওরফে তরুণ সেফুদাকে ফোন লাগালাম। রিং বেজে চললো, ধরলো না। 
আশ্চর্য! সাধারণত এক রিং এই আমার ফোন ধরে ফেলে সাজিদ। আজকে প্রথম পুরো রিং হবার পরও ওকে পেলাম না। কিছু কি হলো ব্যাটার? 
আবারও সেই বেদনাদায়ক ওয়ালপেপার। নীরা কিছু একটা টেক্সট মেসেজে পাঠিয়েছে। পড়ার সাহস হলো না। ফোন বিরক্ত হয়ে পকেটে রেখে দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে একটা বাসে উঠে গেলাম। সাজিদকে আরও দু’বার কল দিলাম, ধরলো না। কেমন যেন মনে কু ডাক দিচ্ছে।
আমার বাসার গলির কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেলো। জনমানবহীন প্রায়। গলির মুখের টং থেকে একটা হলিউড নিয়ে যখন গলিতে ঢুকতে যাবো, তখনই…
“কুমার!”
প্রথমে ভাবিই নি আমাকে ডেকেছে। কুমার নামে তো অনেকেই আছে: কুমার সাঙ্গাকারা, কুমার বিশ্বজিৎ, কিশোর কুমার ইত্যাদি। তাছাড়া আমার নামেও তো কুমার নেই।
তবুও দ্বিতীয়বার ডাকায় ঘুরে দাঁড়ালাম। কন্ঠটাও পরিচিত লাগছিল।
“এ কী! সাজিদ! এ কী হাল হয়েছে তোর!”
একরকম অন্ধকার ফুঁড়ে বের হয়ে এলো সাজিদ। উদোম গা। আবছা আলোতে ঠাহর করতে পারলাম, চোখমুখ ফুলে গেছে বেচারার। গায়ের নানা জায়গায় কাটাছেঁড়া। কোন অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে হয়তো।
“চল ঐ টংটায় যেয়ে বসি। তোকে হাসপাতালে নিতে হবে।”
সাজিদ টলছিলো। আমি কোনমতে ওর এক হাত আমার কাঁধে দিয়ে নিয়ে চললাম টং এর দিকে।
“অযথা…. “
“কী?” ঠিক মতো শুনতে পাই নি ওর বিড়বিড়টুকু।
“অযথা আমাকে নিয়ে সময় নষ্ট কোর না, কুমার।”
“দোস্ত, কথা কইস না। সুস্থির হয়ে বোস। আমি রিক্সা ডাকছি। চাচা একটু ধরেন।”
“আমার কথা শোনো, কুমার…”
“আরে এই ক্রিটিকাল টাইমে কি সব কুমড়া লাউ পটল বলেই যাচ্ছিস। চুপ থাক না। আরে চাচা, পোলাটা অ্যাক্সিডেন্ট করসে, একটু ধরেন না!”
“উনি কিছুই করতে পারবে না। আর ভণিতা করা যাবে না, তোমাকে সব খুলে বলতে হবে।”
“আচ্ছা বলিস,” মেনেই নিলাম ওর কথা। মাথায় চোট পেয়েছে বোধহয়। এর জন্য এইসব উল্টাপাল্টা বলছে৷ 
“আমি ঠিক আছি। ছাড়ো আমাকে, ” বলেই বেশ জোরের সাথে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুটপাথেই বসে পড়লো সাজিদ।
“কুমার আমার কথা শোন। তোমার অনেক বিপদ। এতদিন তোমাকে কিছু বলি নি। আজকে হঠাৎই উদয় হয়েছে দুর্যোগ।”
“সব বুঝলাম। তুই একটু বোস। একটা রিক্সা ডাকি। পানি খাবি?”
“ওহহো, কুমার আমাকে নিয়ে চিন্তা কোর না! আর আমি দুঃখিত আগে আমার পরিচয় দেই নি। এখন অত সময় নেই। তাকাও চারপাশে, তাহলে নিজেই পেয়ে যাবে…”
“ঠিক আছে দোস্ত, ” আনমনে বলেই চেঁচিয়ে উঠলাম, “এই রিক্সা!”
এবং তখনই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম।
অদূরের রিক্সাটা এক চুলও নড়ছে না। শুধু রিক্সা কেন? কিছুই নড়ছে না। আমি যেই টং এর চাচাকে সাহায্যের জন্যও বলেছিলাম, তিনি পর্যন্ত স্থির হয়ে আছেন।
শুধু তিনি স্থির হয়ে থাকলেও মানতাম।
তার হাতে একটা চামচে কন্ডেন্স মিল্ক। যেই ভঙ্গিতে চামচটা ধরা তাতে অনেক আগেই কন্ডেন্স মিল্কটুকুর বেশ খানিকটা নীচে চায়ের কাপে পড়ে যাবার কথা। পড়ে যাচ্ছিলও।
কিন্তু কাপে না পড়ে ঠায় শূন্যে ঝুলে আছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। 
“কি? এবার বিশ্বাস হলো আমার কথা?”
সাজিদের কথায় চটকা ভাঙ্গলো। মাথা নাড়লাম। তখনও কথা বলার মতো শক্তি সঞ্চয় করি নি।
“তাড়াতাড়ি, কুমার! বেশি সময় নেই আমার হাতে।”
“এটা কেন বলছো?” ও তুমি করে বলাতে আমিও তুই করে বলতে পারলাম না আর।
“আহা, সব বুঝবে! এসো! আমার দিকে এগিয়ে এসো।”
মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি এগিয়ে গেলাম সাজিদের দিকে। সাজিদ খপ করে আমার হাতটা ধরলো। 
মনে হলো আমার হাতে যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলাম, হলো না। আমার হাত পুড়িয়ে আমার সারাদেহে যেন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো সেই আগুন। চিৎকার করার চেষ্টা করলাম পারলাম না।
“আমার সময় শেষ, কুমার। বিদায়।”
খুবই ক্ষীণস্বরে কন্ঠটা কানের কাছে বাজলো। প্রতিবাদ করতে গেলাম, পারলাম না। 
আচমকাই সব যন্ত্রণা থেমে গেলো। আমি আবার ফিরে এলাম আমার বাসার গলির মুখে। 
“সাজিদ!” নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠলাম।
চায়ের দোকানে দুইজন কাস্টোমার ছিলো, তারা চমকে উঠলো। চাচাও চমকে উঠল। যেন আমি অতর্কিতভাবে তাদের সামনে উদয় হয়েছি।
উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে লাগলাম। সাজিদ নেই। স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। 
“নেশা করেছে বোধহয়,” বিড়বিড় করে বললো দোকানের একজন।
“এই কি বললেন?” কেন যেন প্রচণ্ড রাগ হলো।
“বলেছি, নেশা করে আসছোস, ” বললো লোকটা। ভালো করে তাকালাম। মাস্তান গোছের মানুষ। চোখেমুখে বেপরোয়াভাব স্পষ্ট।
“এক বাপের পোলা হলে সামনে এসে বল তো।”
লোকটা এবার কোন কথা বললো না। মারমুখী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। সাথে ওর সঙ্গিও দাঁড়ালো। দুইজনের সাথে লড়াই। খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ না। কিন্তু আমার রাগ বেড়েই চলছে। 
ওদিকে এগিয়ে আসছে দুই ষণ্ডা।

…চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *