স্থিরতার শেষে………1

তাপাকে দেখে আমার মেজাজ সপ্তমে উঠে গেলো। কিন্তু এখন মেজাজ দেখাবার সময় না। এক…দুই…তিন…চার…পাঁচ…ছয়। ছয়জন সশস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে লাগতে হবে আমার। সাথে আম্ব্রা থাকলেও একটা কথা ছিলো। তাই আমার সেই ভয়ংকর কাজটি করা উচিৎ।
ভাগো!
বুড়ো খাটাশটাকে ঠেলা দিয়ে আমি লাফ দিলাম দু’টো শেল্ফের মাঝখানের আইল লক্ষ্য করে। 
“ধর শালাকে!”
আমার পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়লো বাউন্টি হান্টাররা। এক তলোয়ারধারী গায়ের ওপর চলে এলো। মাথা নীচু না করলে আমার ধড় আলাদা হয়ে যেত। তার বদলে কোপটা যেয়ে লাগলো শেল্ফের বইগুলোর গায়ে। অনেকগুলো বইয়ের ভেতর দিয়ে তলোয়ারটা একটা কাটা দাগ এঁকে গেলো। একঝাক মিশ্র বইয়ের পাতা এলোমেলোভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ালো কিছুক্ষণ। 
বার কয়েক লাফ দিয়ে ওর নাগালের বাইরে চলে গেলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য কি আর পিছু ছাড়ে? আমার ডানপাশের একটা শেলফ কড়াৎ শব্দে একদম দুইভাগ হয়ে গেলো। ছেড়া বইয়ের পাতা আর মলাট সব শূন্যে উঠে গেলো। কে যেন কুড়াল দিয়ে গায়ের জোরে আঘাতত করেছে শেল্ফটায়। কুড়ালের মাথাটা আমার মাথার সমান!
এভাবে এক শেলফের আড়াল থেকে আরেকটার আড়ালে লুকোতে লাগলাম। আম্ব্রা ব্যবহার করতে পারছিই না। ফ্যান্তাসমা ধরে রাখছি, একদম কোনঠাসা হলে ব্যবহার করবো।
এবং একটা পর্যায়ে কোনঠাসা হয়ে গেলাম। পৌঁছে গেলাম বিশাল লাইব্রেরির এক কোণে। আশ্চর্য! এরা কি নিজেদের ছাড়া সবাইকে বের করে দিসে? পুরা দেখি জন উইক ২ মুভির মতো অবস্থা। 
আমি ফ্যান্তাসমো ব্যবহার করে একজনকে ঘায়েল করলাম।
বাকি রইলো পাঁচ। 
এবং সাথে সাথেই ফাঁদে পড়লাম।
বাকি পাঁচজন আমার ফ্যান্তাসমো দেখে খুব একটা ভড়কালো না। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম আমি নড়তে পারছি না। পেছনে তাকিয়ে দেখি পাঁচজনের একজন আমার শরীরে একটা জাল ছুঁড়ে মেরেছে।
ও শিট!
জালটা ইলেক্ট্রিকিউটেড ছিলো। আমার পুরো দেহে কয়েকশো ভোল্ট বয়ে গেলো। আক্ষরিক অর্থেই। যন্ত্রনায় দুমড়ে মুঁচড়ে যেতে লাগলাম।
“ছাড়িস না, ছাড়িস না। ফ্যান্তাসমো ছাড়াও আরো কোন ক্ষমতা থাকতে পারে,” স্প্যানিশে বললো ওদের কেউ একজন।
“শালাকে অজ্ঞান কর!”
“মরে যাবে না তো এতো শক মারলে?”
জবাবে কি যেন বললো আরেকজন। অত ভালো ভাবে শুনতে পাই নি। মানেটা হতে পারে, “শালার তো টাইম এম্বলেম আছে। দিতে থাক।“
এদিকে আমার হালত টাইট। আমি মোটামুটি নিশ্চিত মৃত্যুর অনেক কাছে চলে এসেছি। ফ্যান্তাসমোও নেই, আম্ব্রাও নেই। ধুঁকেধুঁকে মরা ছাড়া আর কীই বা করার আছে?
শেষ চেষ্টা করলাম। “হে এম্বলেমো দ্য হোরা….আর যদি কোন খ….খ…ক্ষমতা আমার….থেকে….থাকে….তাহলে…এখনই…”
এতদূর বলেই বুঝতে পারলাম আমি কথাটা বাংলায় বলেছি। এই ছাতার মাথার স্প্যানিশ এম্বলেম কী বুঝতে পেরেছে? নাহ, পারে নি। 
আমার নতুন কোন ক্ষমতাই দেখা দিলো না। এদিকে ব্যথায় আমার চেতনার যায়যায় অবস্থা…
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি আমার ভেতরে একটা অস্তিত্ব অনুভব করলাম। একটা না, আসলে দু’টো। পুরানো অনুভূতি। একসাথে।
আমার ফ্যান্তাসমো আর আম্ব্রা ফেরত আসলো। একত্রে।
এরপর কি হলো?
এক কথায় যদি বলি, তাহলে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ ধোলাই বলা যায় একে। পাঁচজনের বিস্ময় মিলিয়ে যাবার আগেই আমি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রথমে যেটাকে হাতের কাছে পেলাম সেটাকে তুলে স্রেফ আছাড় দিলাম একদিকে। ব্যাটা পড়লো যেয়ে একটা ভারী শেল্ফের গায়ে। অত ভারী শেল্ফটা কাঁত হয়ে পড়ে গেলো ওটার পাশের শেল্ফের ওপর। এভাবে কয়েকটা শেল্ফ ডমিনোর মতো একটা আরেকটার গায়ে আছড়ে পড়লো। হাতে পেলাম আর দুইটাকে। জাল যেটা মেরেছিলো সেটাকে ছুঁড়েছিলাম জানালা বরাবর। কাঁচ আর পাতলা রেলিং ভেঙ্গে ছিটকে বাইরে চলে গেলো। বাইরে একটা টাউনস্কয়ারে যেয়ে পড়ে কয়েকটা ড্রপ খেলো। বাকিজনকে একটা চটকানা মারা পর আর দেখি নি ওটার কি হাল হয়েছে। 
আমার নজর পড়লো তাপার ওপর। হারামজাদা এখানেও অবস্থা খারাপ দেখে পালাবার সিদ্ধান্ত নিলো। একটা জানালা ভেঙ্গে লাফ দিয়ে বের হয়ে গেলো। শয়তান বুড়োটাও ওর পিঁছু নিলো।
কিন্তু আমার সাথে পারবে কিভাবে? আমার আছে ফ্যান্তাসমো’র গতি আর আম্ব্রার অমিত শক্তি। দু’টো একসাথে চালাবার একটা অসুবিধেও আছে। আমি তাপার পেছনে পেছনে বের হবার সময় শকওয়েভের চোটে জানালা পাল্লা সুদ্ধ খুলে পড়ে গেলো!
তাপা আর বুইড়া দুইজন দুইদিকে চলে গেলো। বুইড়াকে পরে দেখা যাবে, আমার লাগবে সোনালী চুলের বান্দরটাকে। ব্যাটা দক্ষ বলতেই হবে। খাড়া দেয়ালে দৌঁড়ে ছাদে উঠে যেতে পারে। বানরের মতো এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে লাফিয়েও যেতে পারে। যদিও আমার সাথে দৌঁড়ে পারলো না। আমার আম্ব্রার একটা চিকন ধারা ওর পা ধরে ফেললো। 
তারপর লটকে শূন্যে তুলে ফেললাম। 
চ্যাঁচানো শুরু করলো ব্যাটা। স্প্যানিশে কুৎসিত সব গালি দেয়া শুরু করলো। আমি অর্ধেকই বুঝলাম না।
আম্ব্রা দিয়েই ওর মুখ চেপে ধরলাম।
“শসসস! ছোট্ট বন্ধু! লাফালাফি করো না! স্রেফ পিষে মেরে ফেলবো। স্রেফ কথা বলতে চাই আমি।“
ওর মুখ খুলে দিলাম।
“মার আমাকে! তবুও তোর সাথে…”
আর বলতে দিলাম না। একে তো গাদ্দার এর ওপর ঠাঁটবাট!
মনের শান্তি মতন থাপড়ালাম শালাকে। তিন নম্বর চড় খেয়েই কেমন নেতিয়ে গেলো তাপা। তাও আরেকটা মারলাম। এগুলার বিশ্বাস নাই। ভেকও ধরতে পারে।
পাঁচ নম্বরটা মারার জন্য হাত তুললাম….
“থামুন!”
ঘুরে দাঁড়ালাম। আমরা ছিলাম একটা চারতলা বিল্ডিং এর ছাদে। আগন্তুক আমার কয়েক হাত পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছ’ফুটেরও বেশি লম্বা। কাঁচাপাকা দাড়ি, পেশিবহুল দেহ। বিকেলের আলোতে তাকে লাগছিলো গ্রীক দেবতার মতো। আমি ছবি বানালে একেই জিউস বানাতাম।
“আপনি কে?”
“আমি ওর বাবা।“
“ওর সাথে আমার কিছু হিসেব বাকি আছে। আপনি কি তাপাকে ছাড়াবার জন্য আমার সাথে লড়বেন?”
“তাপাকে যদি প্রহার না করেন, আমার আপনার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হবার কোন ইচ্ছা নেই।“
“এই বঙ্কিমিও স্প্যানিশ বাদ দেন তো!”
“বঙ্কিমিও?”
“ও কিছু না। বোঝাতে চাইলাম সহজ ভাষা ব্যবহার করুন। আপনি কি একজন বাউন্টি হান্টার?“
“জ্বী। আমি বাউন্টি হান্টারদের সর্দার। আর্মান্দো ওলেহান্দ্রো মার্তিনেজ।“
“ছোট নাম নাই?”
“আমাকে ক্ল্যানের কেউ নাম ধরে ডাকে না,” বেশ অপমানিত হলো বলেই মনে হলো সর্দার।
“বাদ দেন। সর্দার বলে আমিও ডাকলাম না হয়। তো সর্দার, আমার কিছু বিষয় জানার আছে। সেগুলো আমাকে জানান, তবে কোন শত্রুতার রেশ থাকবে না আমার পক্ষ থেকে। তবে একটুও কথার খেলাপ করলে আমি সামনে যাকে পাবো, মেরে ফেলবো। ক্লিয়ার?”
লোকটা খুব একটা খুশি হলো না। 
“মৃত্যুকে আমি ভয় করি না, খুমার। আর কথার বরখেলাপও করি না। আপনি লড়াই চাইলে এখানেই শুরু করা যেতে পারে সেটা। আর শান্তি চাইলে আমার সাথে আসুন। আম্ব্রা আর ফ্যান্তাসমো একসাথে ব্যবহার করেছেন। বিশাল অরাজকতা সৃষ্টি করেছেন। রাজা ফার্নান্দেজের রোয়্যাল অফিসিয়ালরা যেকোন সময়ে চলে আসবে।“
“চলুন তবে।“
আমি যে লোকটিকে খুব বিশ্বাস করেছি, তা কিন্তু না। কিন্তু আমার কথাবার্তা বলার প্রয়োজন এখন। ভুল না সঠিক, সেটা পরে যাচাই করা যাবে। কিন্তু এই ক্রোনয়েড জনগোষ্ঠীর কারও সাথে কথা না বললে কোন আগামাথাই পাবো না।
সর্দার তাপাকে কাঁধে তুলে নিলেন। আমি সাজিদের ডায়েরিটা উদ্ধার করতে আবার লাইব্রেরি ফিরে গেলাম। আশপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের লাল ট্রাকও দেখলাম। আমি ফ্যান্তাসমো হয়ে ঢুকেছি আর বের হয়েছি।
লোকটার সাথে আর কয়েক ব্লক দূরেই একটা বাড়িতে যেয়ে উঠলাম। দরজায় একটি নির্দিষ্টতালে নক করলো সর্দার। খুট শব্দে খুলে গেলো দরজা।
ভেতরে কালিগোলা অন্ধকার, কিছু না ভেবেই ঢুকে পড়লাম।

…চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *