স্থিরতার শেষে ……4

আমার ঘুম ভাঙ্গলো সকালবেলা। 
ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
পাশে শুয়ে ছিলো প্যাট। আমার আচমকা নড়াচড়ায় পাশ ফিরে শুলো। 
চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম রুমটাকে দিনের আবছা আলোয়। একটা ডর্ম রুম। দুই বেডের। পাশের বেডের রুমমেট নেই। খাটের পাশে নিজের প্যান্টটা গোল হয়ে পড়তে দেখে চক্ষু চড়াক গাছ হয়ে গেলো। সারা রুম হাতিয়ে নিজের কাপড়চোপড় তুললাম। মেয়েটাকে ওঠানোটা ঠিক হবে না। রাতে যেভাবে মদ ঠুসেছে, এখন উঠিয়ে দিলে স্রেফ হ্যাংওভারের ব্যথায় মারা যাবে। মদ ছেড়ে দিয়েছি, জ্বালা ভুলি নি।
তোয়ালেটা আর কাপড় লাগেজ থেকে বের করে মেয়েটাকে রুমে রেখে আমি করিডোরে বের হয়ে গেলাম। জনশূন্য করিডোর। মাথায় এটা এলো না যে উইকএন্ড চলছে। সবাই সারা রাত পার্টি/তাপা করে এখন ঘুম। শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি আর প্যান্ট পরে ওয়াশরুম অভিজানে বের হলাম। একটা বিশাল ঝুঁকি নিয়েছিলাম ট্রেন থেকে নেমেই। আনার ছদ্মবেশের পরচুলা, ভ্রু, গালের প্যাডগুলো খসিয়ে ফেলেছিলাম। প্যাটরা আমাকে দেখেছে সম্পূর্ণ আমার প্রকৃত রূপে।
গোসল করে রুমে ফেরত আসলাম। প্যাট বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুম থেকে আমাকে দেখলে কি খুশি হবে? না কি ও চায় আমি ওর লাইফ থেকে গায়েব হয়ে যাই? সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। এই সিন সিনেমাতেই দেখেছি। বাস্তবে কি করতে হয় কোন ধারণা নেই।
প্যাট উঠলো পাক্কা দুই ঘন্টা পর।
“উমম! গুড মর্নিং।“
“গুড মর্নিং।“
“কখন উঠলে?”
“এই তো! মাত্রই।“ ওর জন্য বসে আছি বলতে লজ্জা লাগলো।
“উরি বাবারে! গতকাল রাতে বেশি গেলা হয়ে গেছে মদ। তুমি কিছু খেয়েছো?”
“না। চলো ব্রেকফাস্ট করা যাক। আমার ট্রিট।“
বের হয়ে গেলাম আমরা দু’জনে। স্পেনের বেশ একটা ঐতিহ্যবাহী সকালের নাস্তা হলো চুররো। মাখন, ময়দা, চিনি আর ডিম দিয়ে তৈরি ময়ানকে ডুবো তেলে লম্বা লম্বা গজা বানিয়ে ভাজা হয়। এরপর সেটা খাওয়া হয় গলানো চকোলেটের সস দিয়ে। এটা যে কি জিনিস, সেটা না খেলে বুঝবেন না। প্যাটকে বারবার ধন্যবাদ দিলাম এমন একটা জিনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য। 
“তা, মাদ্রিদে আগমনের হেতু কি তোমার, হে আগন্তুক?”
“আমার মা’কে খুঁজে বের করা,” সত্যি কথাই বললাম আমি।
“ও! কোথায় আছেন উনি?”
“সেভিয়ায়।“ 
কথাটা বললাম বটে, কিন্তু কেমন যেন খটকা লাগলো। শত হলেও এই তথ্য আমাকে দিয়েছে আলফান্সো।
“ও! তো কবে যাবে?”
“ঠিক করি নি এখনও। এই বিষয়ে তোমার একটু সাহায্য লাগবে। স্পেনের কিছুই তো চিনি না।“
“সেভিয়া যাওয়া তো কোন ব্যাপারই না! এখানকার আতোচ্চা স্টেশন থেকে উঠবে ট্রেনে। সেভিয়ার কোথায় যাচ্ছো?”
“সঠিক জানি না।“
“পাগল হয়েছো? সেভিয়া কিন্তু ছোটখাটো কোন জায়গা নয়, বিশাল এক শহর। এরমাঝে কই খুঁজবে?”
“উপায় একটা হবে।“
প্যাটকে খুব একটা নিশ্চিত মনে হলো না। “তা আমার নাম্বারটা রাখো। মাদ্রিদে থাকলে কলটল দিও। নাও বলো, তোমার নাম্বার বলো, কল দিচ্ছি।“
যখন দেখলো আমার ফোন নেই, মেয়েটার বিস্ময়ের সীমা রইলো না। 
“তুমি ফোন ছাড়া চলবে কি করে? ম্যাপের অ্যাপ ব্যবহার করার পরেও আমি মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাই।“
“একটা কিনে নেবো। কিন্তু তোমার ফোন থেকে বাংলাদেশে একটা ফোন করতে পারি? সমস্যা নেই, বিল আমি দিয়ে দিবো। “
মেয়েটা রাজি হলো। নাম্বার মুঝস্থ ছিলো। আমি ফোন দিলাম আমার মা’কে। 
“হ্যালো?” 
“হ্যালো, মা?”
“বাবা ফয়সাল। তুই? বাবা, কোথায় তুই?”
“অনেক কাহিনী মা। পরে একসময় বলবো। বিন্তি কেমন আছে?”
“ভালো আর কিভাবে থাকি বাবা? তুইই তো নিখোঁজ। সারাদিন তোর কথা বলে…”
“ওকে একটু ফোনটা দাও না, মা।“
“ইয়ে, ও তো একটু বাইরে। তোর খোঁজেই গেছে। “
“সাথে ফোন তো আছে।“
“ইয়ে, না। ওর ফোনও তো বাসায় রেখে গেছে। ফয়সাল? বাবা? হ্যালো? হ্যালো?”
আমি জানি না আমার কেন যে ভয়ংকর খটকা লাগলো। নিজের আত্মা ঘরে ফেলে যেতে পারে বিন্তি, কিন্তু ফোন না। আম্মা কি চাচ্ছে না আমি বিন্তির সাথে কথা বলি? লাইনটা কেটে বিন্তির নাম্বারে ট্রাই করলাম। বন্ধ। 
গোলযোগ আছে। বিশাল কোন গোলযোগ আছে।
“কিছু হয়েছে কি?”
“না। তেমন কিছু হয় নি।“
“কিছু একটা তো হয়েছেই। বেশ টেনশনে আছো বুঝা যাচ্ছে।“
মেয়েটাকে এখন কিভাবে বুঝাই? এড়িয়ে গেলাম ব্যাপারটা। প্যাটও আর চাপাচাপি করলো না।
প্যাটের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাছাকাছি একটা লাইব্রেরিতে আসলাম। এখানকার পাবলিক লাইব্রেরির ব্যবস্থাপনা খুবই সুন্দর। যত খুশি ইচ্ছে বই পড়া তো আছেই, সদস্য হতে স্পেনের নাগরিক হওয়া লাগে না। এবং সদস্য হওয়াটা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যদিও আমি হতে পারলাম না, কারণ নাগরিক না হলেও একটা ঠিকানা লাগে। মাদ্রিদে আমার সেটা নেই। তাছাড়া মাদ্রিদ শহর ত্যাগ করার সময়ও চলে এসেছে। এরওপর আলফান্সোদের বানানো জাল পাসপোর্ট যদি ব্যবহার করি কোথাও, শত্রুপক্ষ টের পেয়ে যেতে পারে। লাইব্রেরিতে বসে সাজিদের ডায়েরিটা বের করলাম। স্পেনের একটা অ্যাটলাসও বের করলাম। সেভিয়া সম্বন্ধে কিছু পড়ালেখা করলাম। ডায়েরিটার আগামাথা কিছুই বের করতে পারলাম না। স্প্যানিশ পড়তে কিছুটা পারি। কিন্তু আধোআধো বাংলা যে পারে, সে কি বঙ্কিমের উপন্যাস পড়তে পারবে? পড়লেও, কিছু বুঝতে পারবে। হারামজাদা সাজিদ্দার পেটে দেখি জিলাপির প্যাঁচ!
সহসা আমার খেয়াল হলো চারপাশ নীরব। একটু বেশিই নীরব। উঠে দাঁড়িয়েই ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালাম।
আমার সন্দেহ ঠিক। আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিলো কেউ একজন। 
আমাকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে দেখে চমকে উঠলো আগন্তুক। কিন্তু তার মধ্যে কোন অপতৎপরতা দেখলাম না। 
“আমি শুধু আপনার সাথে কথা বলতে চাই, ঘাবড়াবেন না।“
ঘাবড়াই নি আমি। লোকটার পক্ষ থেকে কোন আক্রমণও এলো না। বৃদ্ধ একজন লোক। পড়নে ডাবল ব্রেস্টেড মলিন ব্লেজার। দেখে আমার প্যালাসিয়োর কথা মনে পড়লো।
“কথা বলতে চাইলে চুপিচুপি কেউ আসে?” 
“বুঝতে পারছি না। তোমার স্প্যানিশ…”
“জঘন্য?”
“না, তা না। একটু দুর্বল আর কি, “ হাসলো বৃদ্ধ।
“কথা বলতে চাইলে চোরের মতো আসলে কেন?” ইংরেজিতে বললাম।
“কারণ এটা লাইব্রেরি। এখানে নীরবতাই কাম্য।“ 
“আচ্ছা। আমার সাথে কি কথা?”
“পরিচয় তো হবে আমার সাথে? আমি ডেভিড।“
“আর আমি…”
কথা শেষ করতে পারলাম না। এর আগেই শক খেলাম একটা বুইড়ার হাত ধরতে না ধরতেই। কেমন শীতল একটা অস্বস্তিকর তরঙ্গ আমার হাত থেকে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়লো। অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকালাম। নির্দয় একটা হাসি দিলো ডেভিড।
“মহামান্য কুমার, আপনার আম্ব্রা আর বের হবে না।“
চমকে যেয়ে চেষ্টা করলাম। আসলেই পারলাম না আম্ব্রা ব্যবহার করতে। 
“চেষ্টা করে লাভ নেই। পারবেন না। আর আমার সাথে লাগতে যেয়েও লাভ নেই। চারিপাশে তাকান!”
তাকালাম। আমি বসেছিলাম একটা ডেস্কে। এখানকার লাইব্রেরিগুলো প্রকান্ড। রিডিং স্পেসে সারিসারি সিংগেল ডেস্ক আছে। তার সাথে একটা রিডিং ল্যাম্পও আছে। যেকোন সেকশনের বুকশেলফ থেকে বই এনে যতক্ষণ খুশি পড়েন, কেউ বিরক্ত করবে না।
আমার আশপাশের কয়েকটা ডেস্কে দু’চারজন পড়ুয়া ছিলো। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম তাদের সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। এবং সবার হাতেই চলে এসেছে অস্ত্র। অদূরে দেখলাম দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাপা।
“তোমাদের এশীয়দের ঘটে কোন বুদ্ধিই নেই বাপু! এত ক্ষমতাধর তুমি, একবারও বুঝলে না পুরোটা রাস্তা তোমাকে ফলো করা হয়েছে? এখানে হিরো সাজতে যেও না আবার বন্ধু! গতরাতের ঐ ছাগল গুণ্ডাদের সাথে আমাদের এক কাতারে ফেললে ভুল করবে।“
…চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *