স্বপ্ন অসাধারন গল্প

ভাবি আপনার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার তো সময় হয়ে গেছে, আজ কালকের দিনে যে হাল-চাল মেয়েছেলে বেশি দিন ঘরে ধরে রাখা ভালো না। আমার মেয়েও তো ছিলো; দশ জনে দশ কথা বলার আগে পার করেছি। কত অল্প বয়সেই না মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি! শাড়ি সামলানোর আগে মেয়েটাকে সংসার সামলাতে হয়েছে!
পাশের বাসার আন্টি যখন এসে মায়ের সাথে এসব আষাঢ়ের গল্প জুড়ে দেয় তখন টিভি চ্যানেল চেইঞ্জ করতে করতে কান খাড়া করে সব শুনে রাগে কটমট করতে থাকে রিনি নামের মেয়েটা। ইচ্ছে করে মহিলাটির সামনে গিয়ে বলতে- “আন্টি আপনার মেয়ে তো ডজন ডজন বয়ফ্রেন্ড পুষতো এই কারনেই বিয়ে দিছেন শুধু শুধু হাল-চালের দোষ দেন কেনো?” কিন্তু এসব বলা যাবে না কারন এই মহিলা বাসা থেকে বের হলেই শুরু হয়ে যাবে মায়ের খিস্তি, ইনিও দমে থাকার মানুষ নয় পাড়ায় পাড়ায় রটাবে আজগর সাহেবের মেয়েটা খারাপ, বড্ড খারাপ কাউকে সম্মান দেয়না, আরো কত যে কুকীর্তি করে বেড়ায় এগুলো মুখে আনলেও তওবা পড়তে হবে। পাড়ার মানুষ জানে এই মহিলার ব্যাপারে তবুও কেউ কথা গুলোর গুরুত্ব দেবে না এমন নয়। কথায় আছে “যা কিছু রটে তার একটু হলেও ঘটে” কারো সম্পর্কে নেগেটিভ কিছু শুনলে মানুষ গুলো এ উক্তিটা একটু বেশি মানে। সুতরাং এ আন্টিকে কিছু বলা যাবে না, থাক সে নিজের কথা নিয়ে।

বাবার সাথে ব্যাবসায়ের কাজ কর্ম নিয়ে কথা বলতে এসে যখন দুঃসম্পর্কেরর চাচা বলে ভাই হাতে ভালো পাত্র আছে প্রচুর টাকা পয়সার মালিক। তখন চায়ের কাপ নিয়ে যেতে যেতে কথা গুলো শুনে মেয়েটির ইচ্ছে করে বলতে, “চাচা আমি তো ছেলের টাকা পয়সার সাথে সংসার করবো না।” কিন্তু না, এটাও বলা যাবেনা। তাহলে শুনতে হবে মেয়েটার লাজ শরম নেই।

অনেক সাহস যুগিয়ে যখন মেয়েটা বলেতে পারে মা আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসি। তখন এই প্রশ্নটা আসে না “ছেলেটি কেমন?” তার বদলে প্রশ্ন আসে “ছেলেটি কি করে?” উত্তরটা যখন হয় “ও পড়া শুনা শেষ করতে আরো এক বছর সময় লাগবে তার পর চাকরি করবে।” তখন মায়ের মুখের দিকে আর তাকানো যায় না। আমরা তোর বিয়ে ঠিক করছি ছেলে বিশাল বড় ব্যাবসায়ী, অনেক ধনসম্পত্তি আছে, ভুলে যা ঐ বাদাইম্মাটারে। তখনই বেধে যায় পরিবারটির মধ্যে একটি আন্তঃযুদ্ধ যা বাইরে থেকে বোঝা দুষ্কর। কান্নার কাছে, ধমকের কাছে, ভয়ের কাছে একসময় মেয়েটি হার মেনে নেয়। শুরু হয় কোনো এক নতুন জীবন।

সেই দিনের সেই বাদাইম্মাটা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। মেয়ের বাবার এখন একটাই আফসোস আর কয়টা দিন যদি সবুর করতাম। মেয়ের মায়ের দুঃখ জামাইটা শশুড় বাড়িটাকে আপন ভাবেনা, তখন যে কেনো মেয়ের কথায় কান দিলাম না। হটাৎ কোনো এক দুপুরে মেয়েটির ফোন বেজে উঠে, রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে আসে সেই স্কুল বান্ধবীর গলা। “জানিস রিনি আশিকের সাথে গতকাল দেখা হয়েছে। খুব ভালো একটা চাকরি করে, চাকরির সুত্রে গাড়ি বাড়ি সব পেয়েছে। আর হ্যা, তোর কথা খুব করে জিজ্ঞেস করেছিল।” কথা গুলো শুনে নিস্তব্ধ হয়ে যায় মেয়েটি। আশিককে খুব করে দেখতে ইচ্ছে হয়, জানতে ইচ্ছে হয় সে এখন কেমন আছে। কিন্তু ইচ্ছেটাকে বাড়তে দেওয়া চলবে না। হোক সেটা নিজের সংসার ভাঙ্গার ভয়ে অথবা আবার তার মায়ায় জড়িয়ে যাবার ভয়ে। নিজেকে খুব আপরাধী মনে হয় তার, ঠকিয়েছে সে আশিককে। কোন মুখ নিয়ে আশিকের সামনে দাড়াবে সে? এই সব ভাবনায় ভিতরে ভিতরে এখনো ডুকরে কান্না করে মেয়েটি।

সেই দিনের সেই ছেলেটির এখন আর মেয়েটির উপর কোনো ক্ষোভ নেই। সেও এখন জানে মেয়েটি তখন পরিস্থিতির স্বিকার ছিল। বোকা মেয়েটি তা এখনো না বুঝেই নিজেকে দোষ দিয়ে যায়। রাতের অন্ধকার কাটিয়ে গেছে লাল নীল আলোতে। বিয়ে বাড়ি বলেই এতো সোরগোল তার কোনো একটা কোনে দাড়িয়ে ছেলেটি আজ মৃদু হাসে কেননা সে আজ অন্য কোনো এক বাদাইম্মার স্বপ্ন ভেঙ্গে চূর্ণ করে দিয়েছে। সে জানে এখন তাদের নতুন দম্পতির মাঝে ঠাঁই নেবে কারো অভিশাপ, কিন্তু সে ভয় পায় না কারন সে জানে এই অভিশাপ ক্ষণস্থায়ী। কিছুদিন পরে সেই ছেলেটিও ক্যারিয়ার নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে আবার সেও ভেঙ্গে দেবে আরো এক বাদাইম্মার মন। এই ভাবেই একই ঘটনা বার বার চলতে থাকে শুধু মানুষ গুলো বদলে যায়।

দুপুরের কড়া রোদে বেশিক্ষণ থাকলে কেমন নেশা ধরে।সোহেলেরও কেমন মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।ঝিম ধরা দূপুরে খালি পেটে এক গ্লাস আখের শরবত খেয়ে সোহেলের শরীর আরামে ঢলে পড়তেছে।রিকসার হুডটা তুলে দিতে পারলে ভালো হত।মুখে আরামদায়ক ছায়া পড়ত।

‘ভাইজান,কোনদিক যামু?’ রিক্সাচালক মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘যেই দিকে মন চায়,যান।আর হুডটা তুলে দেন তো মামা।’

রিক্সাওয়ালা বিনাবাক্য ব্যয়ে প্যাডাল ঘুরানো শুরু করে।সোহেল চোখ বুজে ভাবতে থাকে,ব্যাটাকে ৫০০টাকার নোটটা হাতে ধরায় না দিলে ও কি এভাবে তাকে রিক্সায় নিয়ে ঘুরত?সোহেল যখন ব্যাটাকে আখের সরবত খাওয়ালো তখন কেমন সন্দেহের চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছিল।হয়ত,সরবতও খেত না।কিন্ত এই গরমে বরফ মেশানো সরবতও অগ্রাহ্য করা যায় না।
সরবত শেষ করে সোহেল বলল,’মামা,আমার কাছে এই ২০টাকাই খুচরা ছিলো।আপনি এই ৫০০টাকাটা রাখেন।এই টাকায় যত দূর যাওয়া যায় তত দূর যাবেন।তারপর আমাকে আবার এখানে নামায় দিবেন।’
টাকাটা হাতে পেয়ে লোকটার চেহারা অন্যরকম হয়ে গেছিলো।হয়ত সোহেলের মত প্যাসেঞ্জার সে আগে পায় নাই।৫০০ টাকার মূল্য সোহেল জানে।এই টাকায় ও একমাস চালায় দিতে পারত।তারপরেও মাঝে মাঝে এভাবে টাকা খরচ করে।প্রায়ই ওর বাবার সাথে দেখা করতে হয়।গেলেই সে সোহেলের হাতে হাত খরচ ধরায় দেয়।চিন্তা করলেই সোহেলের হাসি আসে।বাপগিরি দেখায়!
মায়ের হাত ধরে যখন সোহেল বের হয়ে আসছিল তখন এই লোকের মায়া মমতা কই ছিলো?ঘেন্না লাগে ওই লোকের কাছে যাইতে।তাও যেতে হয় মাতের কারণে।এই ব্যাপারটা সোহেল বোঝে না।মা এই লোকের মুখ দেখে না,ছায়া পর্যন্ত মারায় না।তারপরেও সোহেলকে বাবার কাছে যেতে হয়,কারণ মা।হাজার হলেও ওই লোক নাকি সোহেলের বাবা!
গেলেই এই লোক নানা কথা বলে,আসার সময় হাতে কিছু গুঁজে দেয়।কিন্ত সেই টাকা সোহেল নিজের জন্য খরচ করে না।যেভাবে পারে বিলিয়ে দেয়।টাকার কথা চিন্তা হতেই ওর স্যান্ডেলের দিকে চোখ গেলো।একটুও খেয়াল নাই,স্যান্ডেলটা সেলাই করতে হবে।রাস্তার মাঝখানে ছিঁড়ে যাওয়াতেই তো রিক্সা নেয়া হল।পকেটে আর একটা টাকাও নাই।রিক্সাওয়ালাকে বললে কি স্যান্ডেলটা ঠিক করে দিবে?
চিন্তা করতে করতেই ঘুমে চোখ জড়ায় আসতেছে।রিক্সাওয়ালা কি জানি বলতেছে সেই কখন থেকে।কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসতেছে ধিরে ধীরে।শুধু সায় দেয়ার জন্যই হু হু করে যেতে লাগল।ঘুমের ভেতরেই মায়ের মুখটা ভেসে উঠল।ছোট বেলা থেকে অনেক কষ্ট করছে এইমহিলা।এবার ও সব ঠিক করে ফেলবে।মায়ের একটা একটা স্বপ্ন পূরণ করবে।আর কয়দিন পরেই ও আর্মির ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিবে। আর জেরিন ?ও ঠিক সোহেলের জন্য অপেক্ষা করবে।ওদের অনেক সুন্দর সংসার হবে।হতেই হবে।

মতি মিয়া পেছনে তাকায় দেখে ছেলেটা ঘুমায় গেছে।রিক্সার হুডে হেলান দিয়ে কেমন অসহায় ভাবে বসে আছে।গাল বেয়ে পানি নেমে আসতেছে।কোন স্বপ্ন দেখতেছে মনে হয়।মতি মিয়া সামনে তাকায়।মিরপুর রোডের দিকে রিক্সা ঘুরায় নেয়।ছেলেটারে কিছু খাওয়াইতে হবে। ক্রিং ক্রিং.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *