বিশাল গেট পেরোলেই চোখে পড়ে বড়সড় লন

আয়নার দিক থেকে ঘুরে আমার বিছানার দিকে পা বাড়ালাম।তখনও আমার মনে হল আয়নার ভেতর মিলি হাসছে।আমার ইস্পাতের মত শক্ত নার্ভও কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভড়কে গেল।চোখ বন্ধ করে ব্রেইন কে বুঝালাম, হ্যালুসিনেশন।
……….
৫ দিনের জন্য অফিস থেকে ছুটি নিলাম।তারপর সরাসরি মিলিদের বাসায় পথে রওয়ানা দিলাম
……
বিশাল গেট পেরোলেই চোখে পড়ে বড়সড় লন। লনের পাশেই ঝর্ণা টাইপ কিছু একটা। একটি সাদা শ্বেত পাথরের পরীমূর্তি মনে হচ্ছে পানির ভিতর থেকে উঠে এসেছে। তার গায়ে ঝরনার জল পড়ছে।নি:সন্দেহে চমৎকার স্থাপনা!
.
বাড়িটাও খুব সুন্দর। এমন সাদা ধবধবে বাড়ি সাধারণত আজকাল দেখা যায়না।বাড়ির একটা পাশে দেয়াল ঘেঁষে বাগানবিলাশ গাছ। এ বাড়ির মানুষের রুচির প্রশংসা করতেই হয়। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম বিশাল ড্রয়িং রুম।আকাশ সেখানে বসা।আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। আমি ছেলেটার ভদ্রতায় ২য় বারের মত মুগ্ধ হলাম।
.
আকাশ বললেন,
“আরে ইলিয়ানা আপনি!আমি আসলে অফিসে যাচ্ছিলাম।দারোয়ান বলল আপনি এসেছেন, তাই শুনে অপেক্ষা করলাম।আমার একটু তাড়া আছে। আপনাকে কাজের মেয়ে দোতলায় নিয়ে যাবে মিলির কাছে।আমি আসি প্লিজ।কিছু মনে করবেননা।”
.
বললাম, ” আমি আসলে মিলিকে নিয়ে আমার ডাক্তার বন্ধুর কাছে যেতে চাই।আপনি অনুমতি দিলে….
–“হ্যা হ্যা অবশ্যই।
রহিমা, এই রহিমা, উনাকে তোমার আপার ঘরে নিয়ে যাও। আমি আসছি ইলিয়ানা।খোদা হাফেজ।”
.
কাজের মেয়ে রহিমার সাথে শ্বেত পাথরের প্যাঁচানো সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। কাজের মেয়েটা বড্ড আলসে মনে হচ্ছে। এইটুকু সময়ে চারবার হাই তুলল।
.
— এইডা আফার ঘর।ভিতরে যাইন।আফা কিন্তুক অসুইস্থ। বেশি বেরক্ত কইরবেননা।
.
আমি হেসে বললাম,
“আচ্ছা আচ্ছা, করবোনা বেরক্ত!
……
ঘরে নক করতেই অচেনা মেয়ে দরজা খুলল। প্রথম দেখায় মেয়েটিকে মনে হবে বিদেশীনি।তারপর ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে,ইনি বাংলাদেশিই,তবে দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। আমি চট করে বুঝে ফেললাম, ইনিই শিমু। বেচারী আমাকে দেখে এমনি কেমন ঘাবড়ে গেছে।অচেনা কেউ বাড়িতে ঢুকেছে,আবার দোতলায় এসেছে,ঘাবড়ানো স্বাভাবিক।আমার আরেকটু ঘাবড়ে দিতে ইচ্ছা হল। বললাম, “শিমু কেমন আছেন? শরীর ভালো?
.
আমার মুখে নাম শুনে শিমু আসলেই ভড়কে গেলো।কিন্তু ন্যানো সেকেন্ডের মাথায় ভড়কানো ভাব দূর হয়ে গেল। 
.
হেসে হেসে বলল, ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন? আপনি তো ইলিয়ানা তাইনা?
.
আমি চমৎকৃত হলাম। মেয়েটা ধরে ফেলেছে।আমি গেইটে থাকতেই আকাশ শিমুকে আমার কথা জানিয়েছেন সেই সম্ভাবনা শূণ্য।কারণ তাহলে দরজা খুলেই সে চমকাতো না। 
মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতি। এখন অবধি তো তাই মনে হচ্ছে।
.
— আমিও ভালো আছি।
–আসুন ভিতরে।
আমি ভিতরে ঢুকলাম।মিলি আমাকে দেখে বেশ খুশি হল বলে মনে হল। মিলিকে বললাম আমরা এখন বাহিরে যাব। মিলি খুশিমনে দ্রুত রেডি হয়ে নিল। মিলি রেডি হতে হতে শিমুর সাথে টুকটাক কথা হল। বেশ চাপা মেয়ে।নিজের থেকে তেমন কথা বলেনা। যা জিজ্ঞেস করি, ছেঁকে ছেঁকে সেইটুকুর জবাব দেয়।তাও টুকটাক তথ্য জানা হল। এরপর শিমুর থেকে বিদায় নিয়ে,আমি মিলিকে নিয়ে আমার ডাক্তার বন্ধুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
…….
মিলি আজ বোরকা পড়েনি। গাড়ি নিতে চাইলে আমি বললাম, 
” চলো মিলি, আজ আমরা রিক্সায় যাই, তোমাকে রিক্সায় চড়ার মজা পাইয়ে দেব আজ। এরপর আর গাড়ি ভালো লাগবেনা।”
মিলি রাজি হলো।
.
রিক্সায় উঠে মিলিকে বললাম,”কেমন লাগছে মিলি?”
— ভালোই আপু
–শুধু ভালো?
— না আপু,বেশ ভালো লাগছে।
— “রিক্সায় চড়ার আসল মজা কি বলোতো?গাড়ির চেয়েও রিক্সায় চড়তে ভালো লাগছে কেন তোমার বলো দেখি।”
— চারপাশটা বেশ দেখতে দেখতে যাওয়া যায়।কত কিছু দেখতে পাচ্ছি!
— হ্যা মিলি। আর তার চেয়ে বড় কথা একমাত্র রিক্সায় তুমি আকাশ দেখতে দেখতে যেতে পারবে।খোলা আকাশ! 
— তাইতো আপু।এজন্যই ডিফারেন্ট লাগছে।
বুঝলাম মিলির মাইন্ডে হাসিখুশি ভাব আনতে পেরেছি।
.
— আচ্ছা মিলি, এখন আমার কথা শুনো।তুমি গতরাতেও আয়নায় ঢুকেছিলে?
— এইটাই বলতে চাচ্ছিলাম আপু। কালকে না আমার ভালো ঘুম হয়েছে।আর আমি আয়নাতেও ঢুকিনি।
— বাহ খুব ভালো কথা। এখন আমার কথা ভালো ভাবে শুনো।তুমি যদি আজও আয়নার ভিতর না ঢুকো তাহলে ভালো কথা, আর যদি ঢুকো,তাহলে ভয় পাবেনা।”
–মানে আপু?
— মানে হল তুমি ভয় পাবেনা। দেখ,তোমার জায়গায় আমি হলে তো উত্তেজনা বোধ করতাম। ব্যাপারটা বুঝতেছো তুমি? তুমি আয়নার ভিতর যেতে পারো!এটা বাকিরা পারেনা। তুমি এরপর থেকে আয়নার ভিতর গেলে চারপাশ টা ঘুরে ঘুরে দেখবা বুঝেছো?
.
মিলি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।বলল, “কিন্তু অভি?”
.
আমি কয়েকসেকেন্ড ভেবে বললাম, ” তুমি বিছানায় শোয়ার আগে হাতে ছুড়ি নিয়ে ঘুমোবে।ঢাকনা ওয়ালা কিছু ছুড়ি আছে। তোমাকে আজ কিনে দেব আমি।”
— ছুড়ি নিয়ে ঘুমোলে কি হবে আপু!
— ছুড়ি নিয়ে ঘুমালে আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি আয়না জগতে ছুড়ি নিয়েই ঢুকবে। অভি তোমার কাছে এলে তুমি ছুড়িটা দিয়ে ভয় দেখাবে। তুমি কিন্তু মোটেই ভয় পাবেনা।ওকে?
— কি যে বলছো তুমি আপু!
–আমাকে বিশ্বাস কর?
— হ্যা আপু অবশ্যই।
— তাহলে আমি যা বললাম তাই করবে।আর ফলাফল কি হলো সেটা আমাকে জানাবে। বুঝেছ?
— আচ্ছা আপু আচ্ছা। 
.
কয়েকমিনিট নীরব থেকে মিলি বলল, “আপু একটা মিথ্যা বলেছিলাম।অভি আমার ক্লাসমেট না,বেশ সিনিওর”
— আগে বললে কি এমন হতো বলোতো! আচ্ছা ইটস ওকে।
……..
বন্ধু সাকিব কে যা বলার বললাম।পুরোপুরি বলিনি ।যতটা প্রয়োজন বলে নিলাম।এরপর সাকিব বেশ কয়েকটা টেস্ট দিলো।টেস্টের রিপোর্ট দুদিন পর পাব। মিলিকে নিয়ে তাই চলে আসলাম।আসার পথে মিলিকে চাইনিজ ছুড়ি কিনে দিলাম।ছুড়ি হাতে নিয়ে ঘুমানোর ব্যাপারটা কাউকে বলতে মানা করে দিলাম।মিলিকে ওর বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে এলাম।আমি ফিরে আসতে নিয়েও আবার ভেতরে গেলাম।মিলির বাবার সাথে দেখা করা উচিত।
.
মিলির বাবার সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, ভদ্রলোকের অবস্থা বেশ খারাপ।আমার সাথে কথা বলতে পারলোনা। তার সাথে যে সার্বক্ষণিক নার্স থাকেন,এই তথ্য আমি এই ঘরে ঢুকে জানলাম। নার্সের আচরণ কেন যেন অন্যরকম ঠেকল আমার কাছে। অন্যরকম নাও হতে পারে অবশ্য।সন্দেহ করতে করতে এখন সবাইকেই সন্দেহ হয়! তবুও মনে হল, আমি যখন অন্যদিকে তাকাই,তখন উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।অথচ আমি চট করে তাকালেই উনিও আমার চেয়েও দ্রুত চোখ সরিয়ে ফেলেন।অদ্ভুত বটে!
……..
ভদ্রলোকের ঘর থেকে বেরিয়ে ডানে গিয়ে সামনের দিকে এগোলে মিলির ঘর।এগিয়ে মিলির ঘরের দরজায় ধাক্কা দেয়ার আগেই আমার হঠাত মনে হল, আমি অদ্ভুত কিছু দেখেছি মিলির রুম পর্যন্ত আসার আগে।কিন্তু খেয়াল করিনি। মিলির ঘরে না ঢুকে একটু পিছিয়ে এলাম।
.
হ্যা, এটা একটা ঘর।মিলির ঘরের একটু আগেই ঘরটা।দরজা লাগানো নয়, ভেজানো। হালকা একটু ফাঁকা রয়েছে যেখানে আমার চোখ পড়েছিল কিছুক্ষন আগে। সাথে সাথে আমার অবচেতন মন বুঝে গিয়েছিল এইখানটায় অন্যরকম কিছু একটা আছে। দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে যা দেখলাম তাতে যে কেউ অবাক হবে।আমিও ভালো ধরনের অবাক হলাম।
………
রুমের চার দেয়াল জুড়ে আয়না। শুধুমাত্র সিলিং আর মেঝেতে আয়না নেই, এছাড়া চারপাশের পুরো দেয়ালে বড় আয়না লাগানো। আমি রুমে ঢুকে অবাক হলাম। একটা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মুখোমুখি আয়না হওয়ায় আমার প্রতিচ্ছবি অদ্ভুতভাবে একটার ভিতর আরেকটা,আরেকটার ভিতর আরেকটা, এমন ভাবে দেখাচ্ছে। কেমন যেনো মাথা ঘুরতে লাগল। পুরো ফাকা একটা রুম,কোনো আসবাবপত্র নেই,খালি রুম জুড়ে আয়না! অদ্ভুত তো!
……
মিলিদের ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম। নিতান্তই ভালোমানুষ টাইপ। কিন্তু তুখোড় বুদ্ধি। কাজের মেয়ে, ড্রাইভার,দারোয়ান,শিমু, আকাশ সবার হিস্ট্রি চেক করলাম। কোথাও কোনো ঝামেলা নেই। গত দুদিন ধরে আমার কি যে হল সেটাই বুঝতে পারছিনা। অদ্ভুত হলেও সত্যি আমি গতরাতের আগের রাতে আয়নার ভিতর চলে গিয়েছিলাম বলে মনে হয়েছিল। সারাদিন আয়না নিয়ে চিন্তা করায় এমনটা হতেই পারে। কিন্তু গতরাতেও একই ঘটনা। এখন আমার নিজেরই রীতিমত আয়নার সামনে যেতে ভয় লাগে! অথচ আমি আয়না দেখতে প্রচন্ড ভালোবাসি। বোধকরি জগতের সকল সুন্দরী মেয়েদেরই আয়নাপ্রীতি থাকে।
………
আমার বড় বোন কানাডায় টরেন্টো ভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে আছে। অনেকদিন পর ভিডিও কলে আপুর সাথে কথা হল। কথায় কথায় মিলির কথাও বললাম।আপু তো হেসেই উড়িয়ে দিল। আরো কিছুক্ষন আপুর সাথে কথা হল। 
ল্যাপটপ বন্ধ করে তৃপ্তির হাসি হাসলাম।
……..
দুইদিন পার হয়ে গেল,মিলি বা আকাশের কোনো খবর নেই। ফোন দিব কিনা বুঝতে পারছিলামনা।ওদিকে মিলির ফিজিকাল টেস্টের রিপোর্ট গুলোও হাতে আসেনি। ভাবতে ভাবতেই দরজায় টোকার আওয়াজ। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে মিলিরা এসেছে। দরজা খুলে দেখলাম, হ্যা বোরকা পড়ে মিলিই দাঁড়িয়ে।
…….
মিলি খুব উত্তেজিত।— 
” ইলি আপু,জানোনা।অবিশ্বাস্য ব্যাপার।আমি পুরো অবাক হয়ে গিয়েছি।”
.
–তোমার পুরো কেস টাই তো অবিশ্বাস্য! কি হয়েছে চট করে বলোতো? এত উত্তেজিত কেন তুমি?
.
— আপু গত দুইরাত আমি ছুড়ি হাতেই ঘুমিয়েছিলাম। সত্যিই আমি আয়নার ভেতরও ছুড়ি সহই ঢুকেছিলাম। অভিকে ভয়ও দেখিয়েছি। আমার এত্ত অবাক লাগছে আপু! তুমি এটা কিভাবে করলে আপু!
.
আমি রহস্যময় হাসি হাসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *