হ্যালো! ম্যাম আপনার নামটা বলুন।

ইতির সাথে আজ প্রথম পরিচয় আমার। আমি ইমন। সহজে কারো প্রতি ইন্টারেস্ট তৈরি হয়না আমার। কিন্তু এই মেয়েটা!
উফফ! অদ্ভুতরকমের ভালো লেগেছে তাকে।

ইতি যখন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাইরে বসেছিল তখন আমি গিয়েছিলাম তদন্ত করতে এবং তাদের লিস্ট তৈরি করতে যারা ফিজিক্স ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল। এর আগেও গিয়েছিলাম কিন্তু ইতিকে পাইনি। তবে আজ প্রথম দেখলাম তাকে। সবাই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কি সুন্দর করে ব্যস্ত আছে মোবাইল নিয়ে। কেউ ফেসবুকিং করছে আবার কেউ মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করছে। এদিকে খেয়াল করে দেখলাম একটা মেয়ে বাটনসিস্টেম ফোন দিয়ে বারবার কল দিচ্ছে কাউকে।

আমি সবার নাম জিজ্ঞেস করে নোট করলাম। কিন্তু এই মেয়েটা একেবারে অন্যমনস্ক। কোনোদিকে খেয়াল নেই তার। শুধু পাগলের মতো ফোনে কি যেন খুঁজছে। নামটা জিজ্ঞেস করতে কাছে গেলাম।

হ্যালো! ম্যাম আপনার নামটা বলুন। ততক্ষণে ফোন আসলো মেয়েটার। এতো তাড়াহুড়ো করে রিসিভ করল যেন বহু প্রতিক্ষিত একটা কল। রিসিভ করেই বলছিল

তিথি! তিথি! 
মা কোথায়? মা?
মাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে রাখ। আমি আসছি একটু পরে।

সম্ভবত ভুল কেউ ছিল ফোনের ওপাশে,

জিজ্ঞেস করছিল সম্ভবত আপনি কে?

আমি ইতি। যার ফোনে কথা বলছেন তার বড় বোন। আপনি সেখানেই থাকুন আমি এসে মোবাইলটা নিচ্ছি।

হয়ত ফোনটা তার বোন হারিয়ে ফেলেছিল। কোনো ইমানদার মানুষের হাতে এসেছিল বলে হয়ত ফেরত দিতে চেয়েছিল।

মেয়েটার মোবাইলের কথোপকথন শুনে জানতে পেরেছিলাম তার নাম ইতি।
তাই আর জিজ্ঞেস করিনি। কিন্তু! 
প্রবলেমে পরে গিয়েছিলাম ইতির নামটা লিখে স্যারকে দিবো কিনা?
আবার এই মেয়েটা তার মাকেই ঘুমের ঔষধ খাওয়ানোর কথা বলছিল কেন?
ভাবতে ভাবতে মেয়েটার নাম লিখিনি। অজ্ঞাত কোন কারনে যে তার নাম লিখে দেওয়া হয়নি তা জানিনা কিন্তু সেদিন হয়ত তার লাক কাজ করেছিল।

কারন সেদিন যাদের নাম লিখে দিয়েছিলাম তারা কঠিন পানিশমেন্ট পেয়েছিল।

তাকে সেদিন আর কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। চলে যাচ্ছিল হনহন করে সম্ভবত মোবাইল ফেরত আনতে। কিন্তু এই দিকে লাক খারাপ তাই যেতে পারেনি। তাকে বাইরে বাহির হতে দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে ক্লাসে বসেছিল। কিন্তু অধিক টেনশন কাজ করছিল তার মাঝে।

ফেস দেখেই বুঝা যাচ্ছিল। তাই নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলাম __বাইরে যাবেন? ক্লাস করবেননা?

মেয়েটা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো হ্যাঁ। 
জানতে চাইলাম কেনো?

বলল সমস্যা। 
কিন্তু আজ আর কোনো ওয়ে নেই সব হায়াত স্যারের কারনে। খুব স্ট্রিক্ট রুলস কলেজ ছুটির আগে কেউ বাইরে যেতে পারবেনা। কোন ধরনের রিকুয়েস্ট চলবেনা।

তাই আর কিছু করতে পারিনি। 
কলেজ ছুটির পর দেখলাম মেয়েটা খুব দ্রুত হেঁটে বের হয়ে গেল। বুঝতে পারলামনা কিছু। প্রবলেম থাকতেই পারে কিন্তু এতো তাড়াহুড়ো করার কি আছে? রিল্যাক্সে গেলেইতো হয়।

তবে বেশি ভাবতে চাইনি ইতিকে নিয়ে তাই একটু অদেখা করে চলে গেলাম আমিও। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সেদিন ইতিকে দেখলাম আমাদের পাশের এলাকায় পাগলের মতো কাউকে খুঁজছে। চেষ্টা করেও নাগাল পেলামনা। আমি এদিকে গেলে সে আরেকদিকে যায়। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার ছিল সে কাঁদছিল। এতো বড় মেয়ে এভাবে কাঁদে নাকি? খুব অবাক হচ্ছিলাম আমি।

আমিও হাঁটা শুরু করলাম তার পিছনে। কিন্তু তার হাঁটার স্পিড আমার চেয়ে তিনগুণ বেশি। তাই বেশিক্ষণ পিছু নিতে পারিনি। অন্যপথে হাঁটা শুরু করলাম আমি। কিন্তু এ কি? আবার দেখা! আমাদের বাড়ির ঠিক পাশের দোকানটা থেকে একজনের কাছ থেকে মোবাইল নিচ্ছে। বুঝতে পারলাম ঐ মোবাইলটা হয়ত যেটার ব্যাপারে কলেজে কথা বলছিল হয়ত!

যাইহোক এড়িয়ে চলে গেলাম।
আজ বাসায় আমি একা। কেউ নেই। তাই রান্না আমাকেই করতে হবে। ব্যাচেলর মানুষ। বন্ধুদের দেখে রান্না শিখেছি কিছুটা। যার মধ্যে ডিম ভাজি সবচেয়ে ভালো করতে পারি।
ভাবছি এটাই করবো। 
তবে একটু রেস্ট প্রয়োজন। আগে একটু ঘুমাই। মেয়েটার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের অবস্থা এমনিতেই শেষ। 
বেশিক্ষণ আর এভাবে থাকা যাবেনা। তাই কিছুক্ষণ রেস্ট করলাম।

রান্নাঘরে গিয়ে ভাত রান্না করলাম প্রেসারকুকারে। ডিম ভাজি করে টেবিলে ভার বেড়ে রাখলাম তারপর গেলাম বাথরুমে ফ্রেস হতে। কিন্তু এসে দেখি বিড়াল সবটাই নষ্ট করে ফেলেছে।
কিছু করার নেই। বিড়ালকে কিছুই বলা যাবেনা।

ক্ষুধাবোধ করছিলাম খুব বেশি। তাই ঘরে তালা দিয়ে বের হলাম রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য। কিন্তু এ কি!
রাত প্রায় এগারোটা। ইতি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে আছে। মনমরা লাগছে খুব। 
প্রথমবার যাকে দেখলাম তাকে প্রথমদিনই এতোবার দেখবো কখনো ভাবতে পারিনি। কৌতুহল নিয়ে গেলাম :
আবার জিজ্ঞেস করার আগেই তার কল এসে গেল:

ফোনটা রিসিভ করেই :
খুঁজে পেয়েছিস তিথি? 
পেয়েছিস!
আমি আসছি। আসছি আমি। পাঁচ মিনিটেই।

বলেই চলে গেলো। বুঝতে পারলাম কিছু হারিয়েছিল। কিন্তু কি?
যার জন্য রাত এগারোটা অব্ধি কেউ বাইরে থাকতে পারে?
খুব ভাবুক হয়ে গেলাম আমি। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালায় বেশিক্ষণ মনে রাখতে পারিনি। 
তাই খাইতে গেলাম রেস্টুরেন্টে।
খেয়েই বাড়ি ফিরে এসে ঘুমিয়ে পরলাম। কাল কলেজে যেতেই হবে। নয়তো খবর হয়ে যাবে।

পরেরদিন :
কলেজে গিয়ে দেখি ইতি একদম ফার্স্টের বেঞ্চে বসে আছে। যেখানে আমি বসি। তবে ভালোই হয়েছে। কালকের ঘটনা জানা যাবে!
ইতির পাশে বসে জিজ্ঞেস করলাম :

ম্যাম! কিছু জানতে পারি?

হুম্ম! বলেন।

আপনার নাম? (যদিওবা আমি নাম জানতাম)

ইতি। আপনার?

ইমন।

আচ্ছা আপনি কলেজে আসেননা কেন?

খুশিতে।

ওহ।

কাল পাগলের মতো কি খুঁজছিলেন?

মাকে।

মানে?

কিছুনা।

আর কথা বাড়ানোর আগে ক্লাস শুরু হয়ে গেল। তাই বেশি কথা হয়নি। তবে ইতির মোবাইল নাম্বারটা নিয়েছিলাম। কারন পরেরদিন কলেজে আসবে কিনা কে জানে?

সত্যিই পরেরদিন কলেজে আসেনি। অনেক চিন্তাভাবনা করে কল দিলাম। কথা হল দুয়েকমিনিট। সুযোগে সেও সব পড়া বুঝে নিয়েছে। যাক তবে মেয়েটা ভালো। কথা বলেই বুঝা গেলো।

মাঝেমধ্যে কথা হত মোবাইলে। কলেজে আসলে ভালোই সময় কাটাতাম। দুজনে বসতাম পাশাপাশি। অনেক কথা হত আমাদের। কিন্তু ইতির অনেক কিছুই জানা হয়নি আমার। জিজ্ঞেস করলেও এড়িয়ে যেতো। অদ্ভুত ক্যারেক্টারের মেয়ে। তাড়াহুড়ো করে আসে আবার তাড়াহুড়ো করেই চলে যায়।

ফার্স্ট ইয়ার শেষ।
সেকেন্ড ইয়ারে ইতি এই পর্যন্ত একদিনও আসেনি। মোবাইলে কল দিলেও রিসিভ করতোনা। খুব চিন্তিত ছিলাম। ভাবছিলাম তার বাসায় যাই। কিন্তু খোঁজখবর দিবে কে? অবশ্য ল্যাম্পপোস্টের সামনে থেকে পাঁচমিনিটের রাস্তা। চারদিক খুঁজলেই পাওয়া যাবে। তাছাড়া ছেলেমানুষের জন্য অসম্ভব কিছু নেই।

বেরিয়ে পরলাম ইতির খোঁজে। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর পেলাম তাদের বাসা। যেটা আমার ফুপির বাসা থেকে বেশিদূরে ছিলোনা।

গিয়ে নক করতেই বেরিয়ে এলো এক মেয়ে

কে?

আমি ইমন।

কাকে চান?

ইতিকে।

কি?

না, মানে আমি কলেজ থেকে এসেছি। কাল সব ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক তাই বলতে এলাম।

ওহ!

ইতির সাথে কথা হয়নি?

না।
মিনিট দশেক বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম কিন্তু ভিতরে যেতে বলছেনা। কি অদ্ভুত মেয়ে মাইরি! এসব ভাবতেই ইতি এসে দাঁড়ালো সামনে ।

আমাকে দেখে খুব অস্বস্তিবোধ করছে।

আরে! ইমন?
বাসায় আসো। আসো।

না। আমার একটু তাড়া আছে।

অতশত বুঝিনা। এসেছ যখন তাহলে বসতেই হবে। আসো প্লিজ।

ভিতরে গিয়ে দেখলাম এলোমেলো চুলে বসে আছে একজন। কি যেন দেখছেন উপরে। আমি যেতেই ঐ রুমের দরজা বন্ধ করে দিলো কেউ। তাই ভাল করে দেখা হয়নি।

ইতির সাথে বসে কথাবার্তা শেষে চা নাস্তা খেয়ে চলে এলাম। কিন্তু ঐ রুমে কে ছিল?
কি এমন রহস্য?

খুব কৌতুহল সৃষ্টি হলো আমার মাঝে। কিন্তু সমাধান নেই। ইতি কিছুই বলবেনা। সর্বক্ষণ চিন্তিত শান্ত স্বভাবের এই মেয়ে খুব স্মার্ট কথা এড়িয়ে যেতে।

কিন্তু আমার জানার আগ্রহ খুব বেড়ে গেল। 
কেন জানিনা?
কারো প্রতি অত্যাধিক দূর্বলতা হয়ত জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তবে কি ইমন ইতির প্রতি অত্যাধিক দূর্বল? 
নাকি অন্যকিছু?
যাই হোক। 
কিছু একটা উপায় বের করতে হবে জানার।

এদিকে ইতিকেও বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু বলেনি। কেনো বলেনি কে জানে?

বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার কাজিন মানে আমার ফুপির মেয়েকে। 
তার কাছে যা জানতে পারলাম তা সত্যিই অবাক করার মত:

বেশ কিছুদিন আগে একটা দূর্ঘটনায় ইতির বাবা মারা যান। সেইসাথে মারা যায় তার ছোট ভাইও। এই দূর্ঘটনা ইতির মা সহ্য করতে পারেননি। মানসিক রোগীতে পরিণত হন তিনি। ঘুমের ঔষধ খাইয়ে রাখতে হয় তাকে। নাহলে সুযোগ পেলেই বাইরে বেরিয়ে পরেন সন্তান আর স্বামীর খোঁজে। তিনি তাদের মৃত্যু আজও মেনে নিতে পারেননি। অপরিচিত কেউ বাসায় গেলে তিনি তার ছেলে মনে করে জড়িয়ে ধরেন। কিছুতেই ছাড়তে চাননা।

আমার কাজিন লিপির কথা শুনে বুঝতে পারি ইতির এত চিন্তিত হওয়ার কারন। সেদিন দরজা বন্ধ করার কারন। 
বুঝতে পারার মত আর কিছুই বাকি ছিলনা।

এরপর যা জানলাম তা আরোও অবাক করে দিল,

ইতির পরিবারের উপার্জনক্ষম কোনো ব্যক্তি নেই। সেই তার পুরো পরিবার চালায়। হাতের কাজ, সেলাই, টিউশনি করেই টানছে পরিবারের সব দায়ভার। এদিকে তাদের যা সম্পত্তি ছিল তার এক আনা ভাগ দেয়নি দাদুবাড়ির কেউ। ইতিও আর কিছু বলেনি। বলবেই বা কি করে? অভিযোগ করার জন্য স্ট্রং হতে হয়
। এজন্যই হয়ত করেনি।
ছোটবোনের পড়ালেখার খরচও সে ই চালায়।

ইতির ব্যাপারে শুনে খুব অবাক হলাম আমি। তার চিন্তিত হওয়া খুব বিরক্ত করত আমাকে কিন্তু আজ আর সেটা করেনা। আমি খুব অবাক হয়ে যাচ্ছি। সাথে লজ্জিত। কিন্তু ইতির প্রতি শ্রদ্ধা আর আকর্ষণ দুটোই বাড়ছে সাথে সাথে।

ইতির ব্যাপারে সব জেনে আমি আর ইতিকে কিছু বলিনি। বুঝতেই দেইনি আমি জানি। তবে বন্ধুত্ব বাড়িয়েছি কয়েকগুন বেশি। দুজনে মাঝেমধ্যে কফিশপে গিয়ে আড্ডা দেই। তবুও আড্ডা আর জমজমাট হয়না তেমন একটা। 
কিন্তু ভালোই লাগে।

একদিন ইতিকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছিল:

কি হয়েছে?

আজ বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। আমার ভাইয়েরও। খুব মিস করছি তাদেরকে।
আল্লাহর কি ইচ্ছা বল দুজনকে একসাথে নিয়ে গেলেন।

চোখে জল। 
কি বলব বুঝতে পারছিলামনা

ইতি ততক্ষণে উঠে চলে গেল। 
আমিও বসে রইলাম চুপচাপ।
ভাবছিলাম একজন মেয়ে কত স্ট্রং হতে পারে সেটা ইতিকে না দেখলে বুঝতামনা। 
ইতির ক্যারেকটার খুব মুগ্ধ করেছে আমাকে। সুন্দরি সে কিন্তু তার অধিক সৎ।

ইতিকে কখন যে ভালবেসে ফেলেছি তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু তাকে জানানোর সময় আসেনি। আগে পড়ালেখা শেষ করে ভাল কিছু করি। তারপর না হয়।
তবে ততদিনে ইতির বিয়ে হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। যার সাথেই হবে হোক শুধু ইতি খুশি থাকলেই হবে ।

কিসব চিন্তাভাবনা নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম তা নিজেও জানিনা। তবে এটুকু ফাইনাল যে ইতি ছাড়া আর কেউ হয়ত এত ইম্প্রেসড কেউ করতে পারেনি। ইতির সরলতায় আমি মুগ্ধ।
তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পরলাম।

পরেরদিন দুপুরবেলা কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখলাম ইতি এক স্বর্ণকারের দোকানে। সম্ভবত কিছু কিনছিল তাই 
বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে চলে এলাম।

ফিরে এসে রেডি হয়ে আবাত কলেজে গেলাম। গিয়ে দেখি লম্বা লাইনের শেষে ইতি দাঁড়িয়ে। ফরম ফিলআপ করতে হবে। কিন্তু এ এতো দেরিতে আসলো কেন? 
আগামীকাল আসলেও পারতো। কিন্তু আজ!
যাইহোক গিয়ে হেল্প করলাম। রুলস ব্রেক। পিছনে থাকলেও ইতির ফরম ফিলআপ আগেই হলো। প্রায় একঘণ্টার মধ্যে শেষ।

তার চলে যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম কানের দুলজোড়া নেই। 
বুঝতে আর বাকী রইলো না পুরো ব্যাপার। ফরম পুরনের টাকা সে কানের দুলজোড়া বিক্রি করে দিয়েছে।

তবে ইতির কাছে আর জানতে চাইনি। চাইলেও সে বলবেনা। অবশ্য যা বুঝা যায় তা নিয়ে গবেষণা তেলে জল মিশানোর মত হয়ে যায়।

ইদানীং যোগাযোগ কম করতে হবে। সামনে পরীক্ষা।

পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো না করলে ভালো কিছুই করা সম্ভব না।

পরীক্ষার সময় পর্যন্ত ইতির সাথে প্রায় দুই তিনবার কথা হয়েছে আমার। 
পরীক্ষা শেষে কোচিং করতে চলে যাই ঢাকা। ইতিও হঠাৎ করে কন্টাক্ট বন্ধ করে দেয়। খুব চেয়েও পারিনি আবার কন্টাক্ট করতে। কিন্তু ইতিকে কিছুই বলা হয়নি। সেও জানেনা আমি তাকে ভালবাসি। তাছাড়া ইতি ভালো থাকুক এটাই চাই।

রেজাল্ট হলো এইচএসসির।
সবাই পাশ করেছে কলেজে। তার মানে ইতিও। যাক এত চাপে পাশ করে বের হয়ে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার।

ইতির সাথে দেখা হয়েছিল মার্কশীট আর সার্টিফিকেট তোলার সময়। খুব সুন্দর লাগছিল সেদিন তাকে। হাসিখুশি মেজাজ। চিন্তা মোটেও নেই।

নিজেই গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

কোচিং করছোনা?

না।

তুমি?

হুম্ম। ঢাকায়।

মাঝেমাঝে খোঁজ নিও।

ইতির এই কথা শুনে হার্টবিট বেড়ে গেল। কি বলছে? খোঁজ নিতে?

তবে তাই নিবো।

প্রতিদিন?

ইতি হেসে বললো না। মাঝেমাঝে।

ওকে। 
দুজনে দুজনকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম।

এদিকে মাঝেমাঝে কথা হয় ইতির সাথে। 
সে ভর্তি হয়ে স্থানীয় শহরের একটা কলেজে। ইংলিশ নিয়ে অনার্স করছে।

আমি চান্স পেয়ে ভর্তি হলাম বাবার স্বপ্নের ঢাবিতে।

পুরোদমে চলল পড়ালেখা। 
এতোদিন শুধু ইতির সাথে ফোনে কথা হয়েছে। মাঝেমধ্যে খোঁজ নিয়েছি। 
কিন্তু পড়ালেখা শেষে আজ জয়েন করেছি একটা কোম্পানিতে। ভালো স্যালেরি।

ইতির কথা বাবাকে বললাম। 
অবশ্য বাবা কিছুই বলেননি। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন তুমি সুখী হবে?

আমি বলেছিলাম হ্যাঁ। খুব সুখী হব।

বাবার অনুমতি নিয়ে ইতির সাথে কথা বললাম :

ইতিকে প্রেমের প্রস্তাব না সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সে রাজী হয়নি। 
কারন তার বিয়ে হয়ে গেলে তার মা আর বোনকে কে দেখবে?
বোনটার পড়ালেখার খরচ কে চালাবে?

খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন। কেউ নিজের পরিবারকে এভাবে আগলে রাখতে পারে? বিশ্বাস হচ্ছিল না। 
তবে ইতি সামনেই ছিল। তাই বাধ্য বিশ্বাস করতে।

পুরো দুমাস ধরে প্রতিদিন ইতিকে বিয়ের জন্য বলেই যাচ্ছি। কিন্তু সে রাজীই হচ্ছিলনা।

একদিন দেখা করে বললাম :

ইতি খুব ভালবাসি তোমাকে।
চাইলে তোমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতাম। কিন্তু না!
তোমার সাথে পুরো জীবন কাটাতে চাই আমি তাই দেরি হল। প্লিজ!

ইমন আমার পরিবারকে কে দেখবে?

আমি দেখবো।

বলা সহজ।

বিলিভ করেই দেখো।

ইতি চুপ করে বসে আছে।

প্লিজ।

সাথে আমার ছোটবোন ছিল।

প্লিজ আপু। মেনে নেওনা। তুমি দেখো ভাইয়া যদি নিজের দায়িত্ব না মেনে নেয় তাহলে তুমি ভাইয়াকে ছেড়ে দিও। বাট একবার দেখো।

ইতি চুপ করে আছে। 
অনেকক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো ওকে।

মানে ইতি রাজি।

তাই আর দেরি না করে ইতির পরিবার থেকে কয়েকজন আর তার ছোট বোনের উপস্থিতে আমাদের বিয়ে হয়।

বিয়ের কয়েকদিন পর ইতিকে নিয়ে এলাম আমার বাসায়। কারন ইতির মাকে বোনকেও নিয়ে এসেছিলাম আমার সাথে।
আমাদের বাসায়।

ইতির সাথে সম্পর্ক সেই পর্যায়ে। সে এখনো বিশ্বাস করেনি আমাকে। সবচেয়ে অবাক করা ছিল ইতির মায়ের সুস্থ হওয়া। তিনি আমাকে নিজের ছেলে মনে করে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ইতির বোনের দায়িত্ব আমার হলেও তিথি আমার কাছ থেকে কোন হেল্প নেয়নি। সে নিজেই পার্টটাইম জব করতে। শত চেষ্টা করেও কিছু দিতে পারিনি।

মায়ের সুস্থতা দেখে ইতিও অবাক। তিনি আমাকে বাবা ছাড়া আর অন্য কিছু বলে ডাকেননি কখনো। ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে যান ইতির মা। বুঝতে পারেন সবকিছু। শোক মেনে নেন। উনার উপস্থিতে আর একবার বিয়ে হয় আমাদের কিন্তু প্রোগ্রাম করে। ইতি খুব খুশী ছিল। খুব খুশী।

সেদিন ইতিকে আমাকে বলেছিল “আমি ভালবাসি তোমাকে। খুব বেশি ভালবাসি। “

আমি আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তার দিকে। কি বলবো বুঝতেই পারছিলামনা। শুধু দুলজোড়া দিয়েছিলাম তার হাতে তুলে যা সে বিক্রি করে এসেছিল ফরম পুরনের সময়। আর এই দুলজোড়া হাতে নিয়ে ইতি আমাকে জড়িয়ে খুব কেঁদেছিল। খুব বেশি। বুঝতে পেরেছিল তাকে আমি কতোটা ভালবাসি। সেই কখন থেকে ভালবাসি তা আর কষ্ট করে বলতে হয়নি।

তবে হ্যাঁ আমি এই মেয়েটাকে খুব ভালবাসি। খুব বেশি।

লেখা : আশনা আরাফ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *