এই বলে দিলাম

আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায়। বাড়ি বিক্রি হওয়ার প্রায় ৩ বছর আগে এক রুমে কেউ একজন সুইসাইড করে। বাড়ি কিনার পর এই বাড়িতে আর আলো জ্বলে নি। এমন কি সূর্যের আলোতেও সারা বাড়ি আলোকিত হয় না। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বাহিরে আসে না, বাহির থেকেও কেউ ভিতরে যায় না। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটে, যার ফলে ১০ জন ব্যক্তি পাশবর্তী ছাঁদ থেকে লাফিয়ে মারা যায়। তাদের সবাই ছিলো মধ্যবয়স্ক। তাই এই বাড়ির আশেপাশে থাকা কোন বাড়িতেও আজকাল কেউ থাকে না।”

এক দমে কথা গুলো বলে একটু শ্বাস নিলেন করিম চাচা।রীতিমতো ভয় পাচ্ছি যদিও সেটা বুঝতে দেয়া যাবে না। কথা না বাড়িয়ে করিম চাচাকে বিদায় দিলাম। রহস্য উদঘাটনে বেশ আনন্দ পাই। এখানে আসার ডিশিসন টা মন্দ হয় নি।
বাড়িটা আমার দাদার ছিল। সেই ১০ জন ব্যক্তিদের মধ্যে আমার দাদা ছিলেন প্রথম ব্যক্তি। দাদার সাথে আমার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। দাদার মৃত্যুর পর অনেকটা ভেঙে পরেছিলাম। বাবা বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে আমাদের নিয়ে অন্য শহরে চলে আসে। 
এক কাপ কফি নিয়ে রকিং চেয়ারে গাঁ হেলিয়ে দিলাম। করিম চাচার বলা গল্পের মাঝে কিছু প্রশ্ন লুকানোই রয়ে গেল। কে ফাঁসি দিয়েছিলো? আর ছাঁদ থেকে লাফানোর ব্যাপারটা? সেটাও মধ্যবয়স্ক লোক কেন? যদি তারা ভয় পেয়েই থাকে হয়তো স্ট্রক করবে সেচ্ছায় সুইসাইড কেন করবে? কেই বা বাড়ি কিনে নিলো? বাহিরে আজান পড়েছে। রুমে বাতি দিতে রকিং চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালাম। হঠাৎ করে পাশের বাসা থেকে লাইটের আলো এসে ব্যালকোনির দরজায় পরলো। কিন্তু করিম চাচা বলে গেলেন এ বাড়িতে আলো জ্বলে না! কেউ থাকেও না! বেশ রহস্যময় তো! কৌতূহল মেটাতে ব্যালকোনিতে গেলাম। রুম থেকেব্যালকোনির দূরত্ব এক হাত নাগাত হবে! সেখানে গিয়ে যেটা দেখলাম তার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না।

সুদর্শন যুবক, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের গোল চশমা পড়া মাটির দিকে তাকিয়ে পায়চারি করছে। আমার দিকে তাকাতেই অদ্ভুত এক শীতল হাওয়া সারা শরীরে ছুঁয়ে গেল। মুচকি হাসি দিয়ে বললো-

–“বিগত দশ বছরে বাড়ির সামনে পিছনে ডানে বামে কোন বাড়িতেই কেউ থাকার দূর সাহস করে নি। আপনার এত সাহস কি করে হলো রেযাহ্? 
–“আপনি যদি ভেবে থাকেন আমার নাম বলায় আমি অবাক হবো তবে ভুল ভাবচ্ছেন!”
–“বেশ ইন্টেলিজেন্ট আপনি!”
–“তা তো বটেই! না হলে কি কেউ আগুনে পা রাখে?

কিছু না বলে আলো নিভিয়ে দিয়ে ভিতরের দিকে চলে গেল। তার সাথে কথা বলার সময় পেছনের সব কিছু এক নজর চোখ বুলিয়ে নিয়েছি। অদ্ভুত রকমের সাঁজানো রুমটা।

সুরুচিবান ব্যক্তি সাথে বুদ্ধিমানও বটে। বিশাল বাড়িতে মাঝের রুমটি বাছাই করেছে যাতে বাহিরের কেউ বলতে না পারে এই বাড়িতে কেউ থাকে। তবে একটা জিনিস ঘটকা লেগেছে। বাড়ির সদর দরজায় মরিচা যুক্ত তালা ঝুলানো। দেখলে মনে হয় বহু বছর এই বাড়িতে কেউ ঢুকে না। মাথায় ঘুরপাক প্রশ্ন গুলোর উত্তর করিম চাচার কাছে পেলে পেতেও পারি। তাকে কল দিয়ে আসতে বলে স্লান সেরে নিলাম। চুলে শ্যাম্পু করে ব্যালকেনিতে তাওয়াল শুকানোর জন্য যাচ্ছিলাম। সেই ছেলেটা হাওয়ার বেগে এসে দুই হাত দিয়ে জানালায় থাবা দিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিশী হাসি দিলো। সারা হাতে এবং ঠোঁটের চার পাশে রক্তের দাগ। মনে হচ্ছিলো রক্তমাখা কিছু কামড়ে খেয়েছে। এই অবস্থা দেখে ভয় পাইনি তেমন নয়। তবে ভয় পেয়েছি সেটা বুঝতে দেয়া যাবে না। নিজেকে শক্ত করে বললাম-

“এগুলো কেমন অভদ্রতা?”.
” আর কখনো মাথায় শ্যাম্পু করবে না। এই বলে দিলাম!”

মুখ ভেংচি কেটে আমি রুমে চলে আসলাম। করিম চাচা এখনো আসে নি। স্যারকে কল করে নিলাম।

” বাড়ি সম্পর্কে যতটুকু স্ট্যাডি করে এসেছিলাম। সামনাসামনি থেকে এই বাড়ি আরো রহস্যজনক স্যার। “
“রেযাহ্! যেটাই করো তার মুখোমুখি হবে না। সে যে হিংস্র সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো?”
“জি স্যার। আমাদের প্ল্যান ‘এ’ কমপ্লিট। আগামী কাল থেকে প্ল্যান ‘বি’ নিয়ে কাজ শুরু করবো। প্ল্যান ‘বি শেষ না হওয়া অবধি আমি আপনার সাথে কলে কথা বলতে পারবো না।”
“টেক কেয়ার” 
“সিউর স্যার”

সদর দরজায় করিম চাচা “রেযাহ্ মা” বলে চেচিয়ে উঠলো। এই লোকের মা বলে ডাকাটা একদম দাদার মতো। হাত ভর্তি খাবার নিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে রুমে ডুকলো। 
“ভয় টয় পাচ্ছো না তো মা? আমি কি মলিকে(তার স্ত্রী) পাঠাবো?”
“না চাচা, গোয়েন্দা পুলিশদের ভয় পেতে নেই যে। আমি এখানে ডিউটিতে আছি। চাচী অকারণেই ভয় পাবে।” 
“সমস্যা হলে জানাবে কিন্তু!”
“আচ্ছা”

করিম চাচা চলে যাওয়ার পর কিছু খাবার প্লেটে নিয়ে রকিং চেয়ারে গিয়ে বসলাম। এক লোকমা মুখে দিতেই ওই ছেলে আবার হাজির। তাকে দেখেও না দেখার অভিনয় করে খেয়ে যাচ্ছি।

“রেযাহ্! আমার সাথে একটু শেয়ার করবে খাবার গুলো? 
” দিতে পারি! বন্ধু হবেন আমার?”
“আপনি এখানে আমার রহস্য উদঘাটনে এসেছেন। পুলিশ হয়তো আমায় এরেস্টও করবে। এক প্রকার শত্রু আপনি।”
“দেখুন! আপনি দেশের ক্ষতি করছেন। এটা তো অন্যায় তাই না?”
“লোহা বেদ করার ক্ষমতা আমার নেই। নয়তো আপনায় শেষ করতে কয়েক সেকেন্ড লাগতো আমার।” 
“হাসালেন জনাব! আপনার কি মনে হয়? আমায় এখানে কোন রকম প্রোটেকশন ছাড়া পাঠানো হয়েছে? হাহাহা। আপনার সদর দরজায় বাহিরে একই খাবার রাখা আছে খেয়ে নিয়েন।”

তাৎক্ষণিক চোখ লাল হয়ে গেল তার। রুমে এসে স্যারকে মেইল লিখতে বসলাম। সব ঘটনা গুলো মেইল করে ঘুম দিলাম। রাত তিনটা নাগাত ভয়ংকর শব্দ শুরু হলো। কখনো হাসির কখনো কান্নার। পানি ঢালা, হাঁটা সহ নানান রকমের বিকট শব্দ। এই কারণেই বোধহয় এই বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না। আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন চোখ লেগে গেল জানা নেই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রুম এসে দেখি ওই ছেলেটা আমার রুমের রকিং চেয়ারে বসা। কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। স্যার বলেছিলো আমি যেন তার মুখোমুখি না হই। কিন্তু উনি স্বয়ং আমার রুমে বসা। স্টেনগানও তো বালিশের তলে রাখা। যদি হামলা করে? কি করবো এখন! 
কাঁপা গলায় বললাম-
“এখানে কি করে আসলেন?”
“হাহাহাহা রেযাহ্! আপনি ভয় পাচ্ছেন? বাহ্! ভাল লাগলো জিনিসটা। ভয় পাবেন না আমি আপনায় খুন করতে আসি নি। গত রাতের খাবারের জন্য ধন্যবাদ দিতে এসেছি। ধন্যবাদ!”
বলেই হাঁটা দিলো সদর দরজার দিকে। আমি তখনও স্তব্ধ হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে। ছেলেটা পিছ থেকে এসে আমার হাত টান দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মুহূর্তে কি করা উচিত আমার ব্রেইনে কাজ করছিলো না। কয়েক সেকেন্ড সেখানে তাকিয়ে থেকে আমায় টেনে তুললো। রাগান্বিত চোখে বললো-
“সময় আছে চলে যান।”

এক পা এক পা করে বিছানায় গিয়ে বসলাম। কয়েক মিনিট আগের ঘটনা আমার ব্রেইনে এখনো ক্যাচ করতে পারে নি। কেমন যেন অন্ধকার লাগছিলো সব কিছু। স্টেনগান হাতে নিয়ে পিছে না তাকিয়ে চালিয়ে দিলাম। রক্ত দিয়ে পাশে রাখা আয়না ভরে গেল। আওয়াজ শুনে পিছে তাকাতে দেখি করিম চাচা কপালে হাত দিয়ে বসে আছে।

“চাচা আপনি?”
“আমি তো সেই সকাল থেকেই নিচে কাজ করছি। তোমায় খাবারের জন্য ডাকতে আসলাম। আর তুমি কি না আমার উপর স্টেনগান চালিয়ে দিলে?”
“আমি বুঝতে পারি নি চাচা। আপনি বাসায় কি করে ঢুকলেন?”
“আমার কাছে চাবি আছে বাসায় ঢুকার।” 
“চাবিটা আমায় দিন। প্রয়োজন ছাড়া বাসায় আসার দরকার নেই। আর আমি সত্যিই দুঃখিত।”

খাবার খেয়ে রুম আসতেই দেখি আয়নায় লেগে থাকা রক্ত গুলো দিয়ে লেখা-
“সময় আছে চলে যান”

আমি মুচকি হেসে লিখার ছবি উঠিয়ে স্যারকে মেইল করে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *