ভাললাগার কিছু গল্প

অদ্ভুত খবর হল, আমেরিকা থেকে একটা বৈজ্ঞানিক দল চলে এসেছেন হেলিকপ্টার পর্যবেক্ষণ করতে। একটা সামান্য যানকে দেখতে আমেরিকা থেকে বৈজ্ঞানিকরা চলে আসবে, এটা খুবই অস্বাভাবিক।
.
টিভি দেখতে দেখতেই হঠাত পুরোনো ব্যাথাটা শুরু হল। কানের ভিতর প্রচন্ড গমগম আওয়াজ হতে লাগল। মাথার ভিতরে মনে হচ্ছে বিস্ফোরণ হচ্ছে।আমি কান চেপে ব্যাথা সহ্য করার চেষ্টা করলাম। আস্তে আস্তে গমগমে আওয়াজটা স্পষ্ট হল। মাথার ভিতর আবার কারো কথা শুরু হল। আমি অবাক হয়ে কথাগুলো শুনতে লাগলাম! কি অদ্ভুত!
…..
আওয়াজ আগের মতই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হল। গম্ভীর ভরাট গলায় কেউ কথা বলতে শুরু করলো।
“ইলিয়ানা, আজ অবশ্যই তুমি একা ঘুমাবে না। তুমি তোমার মায়ের সাথে ঘুমাবে।”
একটা কথা কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হতে লাগলো। একসময় কথাগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো।
আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। এসব কথাবার্তা আমি কানেই তুলবোনা। এগুলো বিশ্বাস করা মানেই নিজের কাছে নিজের বোকা হওয়া। আমি প্রতিদিনের মত আজও একাই ঘুমাবো।একদম একাই।
.
সব চ্যানেলে এই মুহূর্তে যে দুটি ব্রেকিং নিউজ প্রচারিত হচ্ছে তা হল,
১. নাজিরাবাজার কমিউনিটি সেন্টারে আগুন লাগার মূল কারণ যে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার, তা আমাদের হেলিকপ্টার থেকে ভিন্ন। অনেক বেশি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে এটিতে। বিশ্বের নামকরা মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীরা দলে দলে বাংলাদেশ ছুটে আসছেন পর্যবেক্ষণের জন্য।
.
২. আগুনে আহত ও নিহতদের সরকারি সাহায্য দেয়া হবে বলে আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর।
বিবিসি, আলজাজিরা, সি এন এন প্রত্যেকটা চ্যানেলের প্রধান খবর এখন আমাদের দেশে বিধ্বস্ত হওয়া এই হেলিকপ্টার। একদল ধারণা করছেন এই হেলিকপ্টার রাশিয়ার তৈরি নতুন কোনো কিছু। আরেকদম বলছেন এটা স্বয়ং আমেরিকার আবিষ্কার। পুরো ব্যাপারটা কে উনারা বিশ্ব রাজনীতির দিকে টেনে নিচ্ছেন। ওদিকে রাশিয়া না আমেরিকা কেউই এটি স্বীকার করছেনা। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণের আগেই দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেছেন। একদলের বক্তব্য হল, তারা আগেই বলেছিলেন, পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোথাও বুদ্ধিমান প্রানের বিকাশ ঘটেছে। এই অদ্ভুত মেকানিজমের যান টি তাদেরই পাঠানো। 
আরেকদল এ ব্যাপারটি হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছেন। তারা বলছেন ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ না করে কিছুই বলা যাচ্ছেনা। এটা হয়ত ওয়ার্ল্ড টেরোরিজমের সাথে যুক্ত কিছু একটা! 
কে জানে আসলে এটা কি! এত বড় বড় দেশ থাকতে বাংলাদেশের মত ছোট দেশেই কেন এমন বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটবে!
.
খাবার খাওয়ার জন্য আম্মু ডাকছে। আমি টলতে টলতে খাবার ঘরে উপস্থিত হলাম। 
আমাকে দেখেই আম্মু আঁতকে উঠল। 
” তোর চোখের এই অবস্থা কেন? তোর চোখ এত লাল কেন? কি হইছে তোর?”
বলতে বলতেই আম্মু এসে আমার কপালে হাত রাখলেন। দ্বিতীয় বারের মত আঁতকে উঠে বললেন, 
“তোর গায়ে এতো জ্বর! একবারো বললিনা যে? তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেমনে মা? চল দ্রুত মাথায় পানি দিতে হবে”
বাবা বাঁধা দিয়ে বললেন,
“আগে থার্মোমিটার আনি। মেপে দেখা দরকার”
.
থার্মোমিটার দিয়ে মেপে দেখা গেলো জ্বর ১০৫ ডিগ্রী।
আব্বু-আম্মুর সাথে রীতিমত আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। এতোক্ষন কিছু টের পাইনি, এখন হঠাত প্রচন্ড খারাপ লাগা শুরু হল। বাবা দ্রুত বাসার পাশের ডাক্তারের চেম্বারে কল করলেন। আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি সিড়িতে সেই বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। কেমন আজব ভাবে হাসছিলো আমাকে দেখে! ছোটরা বড়দের মত কাজ করতে গিয়ে ভুল করে ফেললে, বড়রা যেমন প্রশ্রয়ের হাসি দেয়, ঠিক সেরকম! বৃদ্ধের চোখে চোখ পড়তেই আমি কৃষ্ণ গহবরের অতলে চলে যেতে লাগলাম। যেখানে কোনো আলো নেই, কোনো শব্দ নেই! শুধুই অমানিশার আধাঁর।
…..
বিশাল একটা প্রান্তরে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। এতো বড় মাঠ অথচ একটা গাছ অবধি নেই। চারদিকের যেদিকেই তাকাই শুধু বিস্তর ধুলোসমেত মাঠই দেখতে পাই। কোনো সীমা চোখে পড়েনা।রোজহাশরের কিয়ামতের ময়দান বুঝি এমনই! আমি কি তবে মারা গেছি? কখন মারা গেলাম? আমি এখানে কিভাবে আসলাম, কেনই বা আসলাম, সেটা বুঝতে পারছিনা। একটু আগে কি হয়েছিল, সেটুকু পর্যন্ত মনে নেই! খালি মনে হয় আমি দীর্ঘসময় ধরে এই প্রান্তরেই একা বসে আছি।
.
বসা থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করলাম। উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। কোনো লক্ষ্য নেই। হঠাত হঠাত মনে হচ্ছে আমাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার মনে হচ্ছে, সেটা কিভাবে সম্ভব! 
.
হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালাম। একটা কালো গোল বৃত্ত। কালো বলতে অন্ধকার। এটা কি গর্ত?
নাহ! শূন্যের ভেতর গর্ত হয় নাকি! কৌতূহল বসত কালো অংশের ভিতরে হাত দিলাম। মুহূর্তেই কোথা থেকে যেনো একদল অদ্ভুত দর্শন প্রানী ছুটে আসতে লাগল আমার দিকে। কিছুক্ষন আগের ধু ধু মাঠ জুড়ে এখন লাখ লাখ অদ্ভুত প্রানী। প্রানীগুলো দেখতে অনেকটা নেউলে অর্থাৎ বেজির মত। কিন্তু গায়ের চামড়া মানুষের মত। আর মাথাটা তুলনামূলক বড়। এটিকে ঠিক মাথা বলা যায়না। কেমন স্বচ্ছ পলিমারের দিয়ে মাথার মগজ আবৃত। নীল আবরণের ভেতর থেকে স্পষ্ট মগজের প্রত্যেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে প্রাণীগুলো জিহবা বের করছে। স্বচ্ছ জেলির মত লকলকে জিহবা যার রঙ প্রতি মুহূর্তে পাল্টাচ্ছে।চোখগুলো কেমন টকটকে লাল রঙের।
আমি বরফের মত জমে গেলাম। এক ইঞ্চি ও সরতে পারছিনা নিজ জায়গা থেকে। আমার দিকেই প্রানীগুলো এগিয়ে আসছে। আমি প্রাণপণ সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে লাগলাম। নিজের ভয়ানক পরিণতির কথা ভেবে ভয়ে, আতংকে দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে। 
সৃষ্টিকর্তা আমাকে বাঁচানোর জন্য কি কাউকেই পাঠাবেন না! প্রানীগুলো আমার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। নিয়তির হাতে সপে দিলাম নিজেকে। আমাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরছে প্রাণীগুলো। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই পায়ে ঠান্ডা কিছু একটার স্পর্শ পেলাম। চোখ খুলতেই দেখি একটা প্রানী তার জিহবা দিয়ে আমার বাম পা পেঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করছে।
.
হঠাত প্রচন্ড সাহস এলো মনে। বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি থেকে আমার বোধ এলো, আমাকে বাচতেই হবে। প্রচন্ড জোরে পা ঝাড়া দিয়ে প্রানীটার জিহবা ছাড়ালাম। তারপর যে পাশটায় প্রানীগুলো নেই, সেদিকটায় প্রাণপণ দৌড়ানো শুরু করলাম। বাম পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছি। কিন্তু তা দেখার সময় এখন নেই। পিছন থেকে মানুষের চিৎকার এর মত আওয়াজ আসছে। তবে অতিরিক্ত কর্কশ এ আওয়াজ। মনে হচ্ছে হাজার হাজার কর্কশ মানুষ, পেচাসহ আরো বিভিন্ন প্রাণী সমস্বরে চিৎকার করছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে অদ্ভুত একটা জায়গায় চলে এলাম।
যেখান থেকে এসেছি, সেই জায়গার চেয়ে এ জায়গা অনেক ঢালু। এজন্যই এখানটা আমার চোখে পড়েনি। প্রচুর ভাঙাচোড়া ইলেক্ট্রনিকস আছে এখানে। অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেক কিছু আছে এখানটায়। কিছু কিছু জায়গায় ভাঙা দেয়াল। প্রাথমিকভাবে দেখে মনে হচ্ছে কোনো নগরী বা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ।
আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম। 
হঠাত কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকলো বলে মনে হল। এদিক ওদিক দেখতেই আমার চোখ পড়ল শূন্যে সাদা স্ক্রিনের মত কিছু একটা একা একাই তৈরি হচ্ছে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম। একসময় সেখানে বিদঘুটে কিসব লেখা উঠতে থাকল যার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছিনা। হঠাত মাথায় তীব্র একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলাম। সাথে সাথে দেখলাম এই দুর্বোধ্য অক্ষর আমি পড়তে পারছি।
.
” সমীকরণ ভুল, সমীকরণ শুদ্ধ, সমীকরণ শূন্য, সমীকরণ বিপদ, ত্যাগ করা উচিত, মৃত্যু ভয়ংকর “
.
এ কেমন অদ্ভুত কথা। আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছেনা! কিসব ভুল, কিসের ঠিক আর কিসেরই বা বিপদ!! 
আমি সব ভুলে হা করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বারবার একই লেখা ভেসে উঠছে স্ক্রিনে।
…..
দশ মিনিট হয়েছে কি হয়নি, হঠাত সেই তীব্র কর্কশ শব্দ কানে এলো। স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে চারপাশে দেখতেই আবারো ভয় গ্রাস করলো। সেই প্রানীগুলো ছুটে আসছে আমার দিকে। আবার তারা আমাকে খুঁজে পেয়েছে। আমি আবারো দৌড়াতে লাগলাম। এবার আমি পৌঁছালাম আগের জায়গাটিতে, যেখানে মাটির চার ফুট উপরে শুণ্যে কালো অন্ধকার একটি বৃত্ত ছিলো এবং এখনও আছে। আমি আরো সামনে এগুনোর পূর্বেই আমার মাথার ভেতর আগের মত গমগম আওয়াজ শুরু হলো। বুঝলাম এখনই কোনো নির্দেশনা দেয়া হবে আমাকে। এত আতংকের ভেতরও আমি খেয়াল করলাম, এবার আর আমার মাথায় তীব্র ব্যাথাটা হয়নি। হালকা চিনচিনে একটা ব্যাথা হচ্ছে শুধু। গমগম আওয়াজ স্পষ্ট হলো। মাথার ভিতরে কেউ বারবার বলতে লাগলো, 
“শূন্য বিহবরের দিকে মুখ করে দাড়াও, অন্যদিকে যেওনা”
আমি সেটাই করলাম। কিন্তু তারপর? তারপর কি করব তা তো কেউ বলছেনা। আগের কথাটাই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আমি প্রাণপণ মনে মনে চেষ্টা করছি তাদের বুঝাতে যে, 
“এখন কি করব বলে দিন আমায়”
আফসোস আমি কাদের উদ্দেশ্য করে এই কথাটি মনে মনে ভাবছি, তা আমি নিজেই জানিনা! তাদের সাথে যোগাযোগ করার উপায়টাও আমার জানা নেই! 
.
এদিকে প্রানীগুলো তাদের কুৎসিত শরীর নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। 
আচমকা একটা ব্যাপার মাথায় এলো। আমি মনে মনে যা ভাবি, তা একমাত্র সেই বৃদ্ধ জানতে পারে। 
সাতপাঁচ ভেবে আমি মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে আর্জি জানালাম,
” বৃদ্ধকে আমার খুব প্রয়োজন,খুব বেশি “
.
প্রানীগুলো আমার থেকে আর মাত্র ২ গজ দূরে। আমার চারপাশ থেকে এগুলো আমায় ঘিরে রেখেছে।অদ্ভুত ব্যাপার, এখন আর তারা দ্রুতবেগে ছুটছে না। শিকার তাদের হাতের কাছে। ধীরে ধীরে এগুলেও সমস্যা নেই এমন ভাব।
.
মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নিয়ে যখনই মাটিতে বসে পড়ব, ঠিক তখনই বৃদ্ধের দেখা পেলাম। কখন, কোথা থেকে বৃদ্ধ এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে আমি জানিনা। আচমকা উনি আমার হাত ধরে টান দিলেন। সেই কালো বৃত্তের কাছে আমাকে নিয়ে এলেন। প্রানিগুলো আমাদের থেকে মাত্র এক হাত দূরে, এমন সময় কালো বৃত্ত থেকে প্রচন্ড আলো ছড়াতে লাগল। কেউ প্রচন্ড জোরে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সেই শুন্য বৃত্তের গর্তে ফেলে দিলো। প্রচন্ড আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। এর সীমা কতটুকু আমার জানা নেই, আদৌ সীমা আছে কি না তাও জানিনা, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে আমার মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *