ভালবাশি আমি তোমায়

মাথার ভেতর কে জানি কথা বলে উঠল, 
“ভয় পেয়োনা। তোমাকে আমরা বাঁচাবো। সব বিপদ থেকে রক্ষা করবো।”
.
আমি চোখ বন্ধ করে নিজেকে বুঝালাম,
“সবই আমার অসুস্থ মস্তিষ্কের কল্পনা। অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক উল্টাপাল্টা সিগনাল দিচ্ছে।”
লাভ হলোনা! মাথার ভিতর ভাঙা রেকর্ডার এর মত কথা বাজতেই রইলো! 
চোখ খুলেই যা দেখলাম, তাতে আমার দু’বার হার্টবিট মিস হল।
…..
মনে করুন আপনি চোখ বন্ধ করে আছেন। হঠাত চোখ খুলে তাকাতেই দেখলেন একজোড়া সবুজ চোখ আপনার মুখের উপর ঝুঁকে এতক্ষন আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছিলো। চোখ খুলেই মুখের উপর এমন অদ্ভুতভাবে কাউকে ঝুঁকে থাকতে দেখলে আপনার কেমন লাগবে?
.
চোখ খুলেই সেই বৃদ্ধকে মুখের উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে আমি প্রচন্ড ভাবে চমকালাম এবং ভয় পেলাম। একটু হলেই বোধহয় হার্ট ফেইল করতাম! আগে থেকেই যে পানির পিপাসা পাচ্ছিলো, তা বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেলো। 
একমিনিট আগেও আমি দেখলাম, পুরো এম্বুলেন্সে আমি একা। হঠাত এই বৃদ্ধ এখানে কিভাবে এলেন? আমার মাথা ঝিমঝিম শুরু হলো। চলন্ত গাড়িতে কিভাবে এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে তার লৌকিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। আর অলৌকিক কোনো কিছু কোনোদিনই বিশ্বাস করিনি। তবে আজ আমার সাথেই কেন…
.
বৃদ্ধ একটা জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো, 
” মে বি ইউ আর থার্সটি। প্লিজ ড্রিংক সাম ওয়াটার লিটল গার্ল “
আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। চিনিনা, জানিনা, তার উপর এখানে কেমনে আসলো তাও বুঝতে পারছিনা, এমন অবস্থায় উনার দেয়া জল খাওয়া কি ঠিক হবে? কিন্তু এতো পিপাসা পাচ্ছে যে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পানি না পেলে আমি আর বাঁচবোনা।
বৃদ্ধ বলে উঠলো, 
“ইটস পিউর এন্ড সেফ।ডোন্ট ওয়ারি। টেক ইট। আই এম ইউর গুডউইশার নট ইউর এনিমি।”
আমি ভড়কে গেলাম। লোকটা আমার মনের কথা কিভাবে বুঝল! আমি কথা না বাড়িয়ে বোতল টা নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেলাম।
বৃদ্ধ ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছেন। কে ইনি? কি চায় আমার কাছে? 
আমাকে কি উনি বাঁচালো? 
উনার কি আসলেই বিপদ টের পেয়ে কাউকে বাঁচানোর ক্ষমতা আছে? 
যদি তাই হয়,তাহলে বাকীদের কেন বাঁচালোনা? শুধু আমিই কেন?
আমি মনে মনে গুছিয়ে ফেললাম কি কি প্রশ্ন করবো অদ্ভুত এই বৃদ্ধকে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করার জন্য উনার দিকে তাকাতেই দেখলাম উনি হাসছেন। কুটিল হাসি নয়, কেমন অদ্ভুত মমতাভরা হাসি। উনার চোখে চোখ পরতেই কিছু একটা হল। মনে হলো আমি গহীন অতলে হারিয়ে যাচ্ছি, যার। কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। পুরোটাই গহীন, নির্জন, , অন্ধকার..
…..
রাত ৮.৩০। দ্বিতীয় বারের মত চোখ খুলে নিজেকে বাসায় আবিষ্কার করলাম। মাথার কাছে মা-বাবা কে দেখতে পেলাম।
তাদের থেকেই জানতে পারলাম, কমিউনিটি সেন্টারের সেই ট্রাজেডির পর দ্রুত আহতদের সবাইকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল। আমাকে রাস্তার পাশে জ্ঞান হারাতে দেখে রাস্তার লোকজন এম্বুলেন্সে তুলে দিয়েছিল। তারপর সাথে থাকা মোবাইল ফোনের কৃপায় এখন আমি বাসায় আমার নিজ বিছানায় শুয়ে আছি।
ভাগ্যের ফেরে আমি বেঁচে আছি, অথচ আমার কাছের বন্ধুদের কি অবস্থা, আমি তা জানিনা। বারবার ঢুঁকরে কান্না পাচ্ছে। মায়ের সাহায্যে উঠে সামনের রুমে গিয়ে টিভি ছাড়লাম। প্রত্যেকটা চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ আজ এটাই। খবরের চ্যানেলগুলোতে ঘটনাস্থল লাইভ দেখাচ্ছে। আমি মা কে জড়িয়ে ধরে বসে আছি।ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছি। কি ভয়ংকর! ছয় ঘন্টা পার হল, এখনো আগুন জ্বলছে।
.
” ৮০-৮২ টা পুরোপুরি দগ্ধ লাশ এখন অবধি বের করা হয়েছে। সিড়িতে আগুন ছড়ানোর কারণে কেউ বের হতে পারেনি। লাশগুলো দেখে চেনার উপায় নেই কোনটা কার লাশ। কয়েকজন আবার ছাদে উঠে লাফ দিতে গিয়ে আহত হয়েছে। শখানেক মানুষ, যারা তৃতীয় তলায় ছিলেন তারা নিহত না হলেও গুরুতর আহত। আশেপাশের হাসপাতাল গুলোতে তাদের নেয়া হয়েছে। নিহতদের এবং অতিরিক্ত গুরুতরদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে।”
এসব খবর দেখছি আর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কত স্বজনদের আহাজারি, চিৎকার! আজ হয়ত এদের সাথে আমার বাবা- মা ও থাকতেন! মনে মনে আল্লাহকে কোটিবার ধন্যবাদ দিলাম।
….
অদ্ভুত হলেও সত্যি, রাতে বেশ ভালো ঘুম হলো। এক ঘুমে রাত শেষে সকাল। সকালে খবর পেলাম বন্ধুদের মধ্যে রিয়া আর তামান্নার বর ছাড়া আর কারো খবর পাওয়া যায়নি। রিয়ার শরীরের ১৯ শতাংশ পুড়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ অর্গান গুলো না পোঁড়ায় এ যাত্রায় সে বেঁচে যাবে বলে ডাক্তাররা আশাবাদী। 
আমি ভাবছি আমার কথা।গতকাল দুপুর থেকে যা যা হলো, তা কি শুধুই আমার কল্পনা? নাকি অন্য কিছু? আমার বেঁচে যাওয়া, মাথার ভিতরে কথা বাজতে থাকা, অদ্ভুত সেই বৃদ্ধ!
সবকিছু মিলিয়ে আমি একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম।
…..
দুইদিন কেটে গেলো। মানসিকভাবে যতটা ভেঙে পড়েছিলাম, তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। ভাগ্য বলতে একটা জিনিস আছে। তাই পুরো ঘটনাটিকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবেই মেনে নিলাম। 
.
দুইদিন কেটে গেলো, অথচ সেই বৃদ্ধ কে আমি আর দেখিনি। এমনকি মাথার ভেতর কারো কথাও শুনিনি। অদ্ভুত যে শারীরিক যন্ত্রনা অনুভব করতাম, সেটাও আর হয়নি। সুতরাং আমার ব্যাখ্যাই ঠিক। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছোটবেলা থেকেই খুবই সক্রিয়। এর প্রমাণ আমি বারবার পেয়েছি। এবারও এমন কিছুই হয়েছে। আমার সুপ্ত ইন্দ্রিয় আমাকে বারবার বুঝিয়েছে সামনে বিপদ। মস্তিষ্ক এমন এক বৃদ্ধকে বানিয়ে আমার সামনে এনেছেন, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। মাথার ভিতরে কথা বলা, মাথার ভিতর ব্যাথা হওয়া পুরোটাই আমার হ্যালুসিনেশন। হ্যা, এটাই হয়েছে। তারপরও এই ব্যাখ্যায় বেশ কিছু ফাঁক আছে! সে যাই হোক, অলৌকিক কোনো কিছু এই পৃথিবীতে হতেই পারেনা।নেভার!
.
“হা হা হা হা হা, কে বলেছে হতে পারেনা লিটল গার্ল? পুরো জগতটাই তো অলৌকিক। “
.
পিছনে ফিরেই আমি চমকে উঠলাম। সেই বৃদ্ধ আমার রকিং চেয়ারে বসে আছেন। গায়ে সেই পুরোনো পোশাকটাই। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বারবার বুঝালাম নিজেকে, 
” এটা কিছুই না, চোখ খুললেই দেখব কিচ্ছু নেই। আমার ঘরে আমি একা, কেউ নেই,কেউ না! “
.
আমার ধারণা কে ভুল প্রমাণ করে চোখ খোলার পরও বৃদ্ধকে আগের জায়গাতেই দেখা গেলো। আমি এবার সরাসরি প্রশ্ন করলাম,
” আপনি স্পষ্ট করে বলুন আপনি কে? আমার কাছে কি চাই আপনার?”
.
বৃদ্ধ হেসে জবাব দিলো, 
” আমি তোমাকে বাঁচাতে চাই মাই লিটল গার্ল। তোমার সামনে বড় বিপদ “
–কিসের বিপদ? আমার কেন বিপদ হবে। আমি কি করেছি?
বৃদ্ধ সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
” তুমি অজান্তেই বিশাল একটা কাজ করে ফেলেছো। তোমার এই কাজ তোমাকে খুব ভোগাবে। কিন্তু আমি এবং আমরা তোমাকে বাঁচাবো।”
.
আমি কিছুটা রেগে গিয়েই বললাম, 
” আপনার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করিনা। আপনি কোথাও যাবেন না। আমি এখনই মা কে ডেকে আনবো। মা আসলেই প্রমাণ হবে আপনার অস্তিত্ব আসলেই আছে নাকি আপনি আমার অসুস্থ মস্তিষ্কের কল্পনা!”
.
বৃদ্ধ হঠাত গম্ভীর হয়ে বললেন,
“আজ রাতে তোমার সারা শরীরে ভীষণ কষ্ট হবে। তোমাকে প্রচন্ড ভয় দেখানো হবে। কিন্তু তুমি মোটেও ভয় পাবেনা। মনে রাখবে তোমাকে বাঁচাব আমি এবং আমরা। তুমি প্রচন্ড মেধাবী ও বুদ্ধিমতী মেয়ে। আশা করি তোমার সমস্যা হবেনা। সবসময় চোখ কান খোলা রাখবে। মনে রাখবে, ছোট্ট একটা ঘটনার পিছনেও বড় কিছু লুকাইত থাকে।”
.
আমি উনার কথাগুলো শুনে হতভম্ব হলাম। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখি চেয়ারে কেউ নেই। তাহলে কি স্বপ্ন দেখছিলাম এতোক্ষন! এতো বাস্তব হয় স্বপ্ন! 
উহু, এটা স্বপ্ন না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রকিং চেয়ারটা এখনও এমনভাবে দুলছে যেন মাত্রই কেউ এখান থেকে উঠে গেলো। 
আমার আর কিছু ভাবতে ইচ্ছা করছেনা। এতো রহস্য কেন আমার চারপাশে? নাকি এসব কারো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা? যদি তাই হয়,তবে কার পরিকল্পনা? উফ এসব আর ভালো লাগছেনা। তারচেয়ে বরং ম্যাথের খাতাটা নিয়ে কিছুক্ষন বসি। এই একটা জিনিসই আমার প্রিয়, কিছুটা মানসিক শান্তি পাব!

রাতের খবরে খুব অদ্ভুত একটা বিষয় জানলাম। ব্যাপারটা হল, যে হেলিকপ্টারটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আছড়ে পড়েছিলো, সেটি কোথাকার হেলিকপ্টার কিংবা কার হেলিকপ্টার সেটা জানার জন্য তদন্ত দল গঠিত হয়েছিল। তারা যে অদ্ভুত তথ্য জানাচ্ছে তা হল, উক্ত হেলিকপ্টারে কোনো চালক কিংবা মানুষ ছিলোনা। এটা মোটেই অদ্ভুত নয়। কারন ইদানিং ড্রোন কিংবা কম্পিউটার চালিত বিমান,হেলিকপ্টার তৈরী হচ্ছে। তবে অদ্ভুত খবরটা হল, আমেরিকা থেকে একটা বৈজ্ঞানিক দল চলে এসেছেন হেলিকপ্টার টা পর্যবেক্ষণ করতে। একটা সামান্য যানকে দেখতে আমেরিকা থেকে বৈজ্ঞানিকরা চলে আসবে, এটা খুবই অস্বাভাবিক।
.
টিভি দেখতে দেখতেই হঠাত পুরোনো ব্যাথাটা শুরু হল। কানের ভিতর প্রচন্ড গমগম আওয়াজ হতে লাগল। মাথার ভিতরে মনে হচ্ছে বিস্ফোরণ হচ্ছে।আমি কান চেপে ব্যাথা সহ্য করার চেষ্টা করলাম। আস্তে আস্তে গমগমে আওয়াজটা স্পষ্ট হল। মাথার ভিতর আবার কারো কথা শুরু হল। আমি অবাক হয়ে কথাগুলো শুনতে লাগলাম! কি অদ্ভুত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *