নিশি কন্যার ডাক

শফিক উদ্যানে বসে আছে। নিশি কন্যার বয়ান মতে, আজ তার প্রেমিকা আসবে। মেয়েদের প্রতি সব ছেলেদেরই দুর্বলতা কাজ করে। শফিক নেশাগ্রস্থ হলেও সে ছেলে। প্রেমিকা কেমন হতে পারে, তা ভাবাটা রোমাঞ্চকর। কখনও দ্যাখি নি, কিচ্ছু জানি না, হুট করে একটা মেয়ে জীবনে চলে আসবে; বিংশ শতাব্দীর এই যুগে তা সম্ভব…? নিশি কন্যা-টাই বা কে? কি তার পরিচয়? কেনই-বা সে বেকারদের চাকুরী দেয়…? এই জগতে কেন এত মিরাকল ঘটে? মানুষ মিরাকলে বিশ্বাসী বলেই কি? ঈশ্বরকে কেও কখনও দ্যাখে নি, তবুও মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করে। কেও বুঝে করে, কেও না বুঝে করে। কেওবা আবার সমাজের সাথে তাল মেলানোর জন্য করে। ঈশ্বর খুব সম্ভব এদেরকে পছন্দ করেন না। ব্যক্তিত্বহীন আস্তিকের চেয়ে, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নাস্তিকই ভাল।
একটা মেয়ে পেছন থেকে বলল, আপনার নাম কি শফিক?
শফিক ঘাড় ঘুরিয়ে দ্যাখল, একটা অপ্সরী তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছে। দাঁত বের করে হাসা শফিকের অপছন্দ, খুব কম সংখ্যক মানুষকেই বত্রিশটা দাঁত বের করে হাসলে সুন্দর লাগে। এই মেয়েটাও ‘খুব কম সংখ্যক’ এর অন্তর্গত। শফিক মাথা দুলিয়ে বলল, জি।
আমার নাম পুষ্পিতা। সবাই আমাকে পুষ্প বলে ডাকে। গোটা নাম পুষ্পিকা পাল। অবাক হলেন তো?
শফিক সত্যিই অবাক হলো। মেয়েটা আবার দাঁত বের করে বলল, পুষ্পিতা, পুষ্প বা পুষ্পিকা; আপনার যেটা পছন্দ, সেই নামে ডাকবেন। নো প্রবলেম।
আপনি কি আমাকে চেনেন?
ব্যক্তি চিনি না, নামটা চিনি শুধু। শফিক আপনার নাম। পেশায়- বেকার। লেগুনার হেল্পারী করেছিলেন একদিন। আমি তখন আপনার লেগুনায় করে অফিসে যাচ্ছিলাম। অইদিন একটা ব্যাপার আপনি লক্ষ্য করেন নি।
শফিক অবাক হতে শুরু করেছে। মেয়েটার মানুষকে অবাক করে দেয়ার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। মুহূর্তে ইন্টারেস্ট এনে দেয়া মানুষগুলো, মুহূর্তেই ইন্টারেস্ট কমিয়ে দেয়। মেয়েটি তেমন নয়। শফিক বিস্মিত গলায় বলল, কোন ব্যাপারটা বলুন তো।
বর্তমানের মেয়েরা অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। লেগুনায় আমার সিটের অপজিটে দুটা মেডিকেলের ছাত্রী বসেছিল। আপনি তখন লেগুনার দরজায় দাঁড়িয়ে মুক্ত জীবনানন্দ হয়ে আছেন। তারা শয়তানের মতো ফিকফিক করে হেসে আপনার প্যান্টের চেইনের দিকে তাকিয়েছিল আর হাসছিল। একজন তো আবার উচ্চতাও মাপছিল। হি হি হি! কি অসভ্য দ্যাখলেন! আবার তারা নামার সময় আপনার ইয়েতে তাদের একজন আলতো করে ছুঁয়েও দিয়েছিল। আপনি ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করেন নি। কতটা নিচে নেমে গেছে তারা! অবশ্য সবাই না। যাক গে! কফি খাবেন?
শফিক ঠিক এই মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, তার কি আরও অবাক হওয়া উচিত, নাকি হো হো করে হেসে দেয়া উচিত। পুষ্পিতা ব্যাপারগুলো ভালকরে লক্ষ্য করেছে। কি জানি! হয়তো মেয়েদের মন মেয়েরাই ভাল বুঝতে পারে। শফিক উঠে দাঁড়াল। অপ্সরীদের কফি খাবার প্রস্তাব ফেলে দেয়া যায় না। তার আবার ভয়ও করছে। কে যেন বলেছিল, সুন্দরীদের একজনের সম্পত্তি হলে মানায় না, তারা হবে সকলের সম্পত্তি। এই কথাটা হারিয়ে ফেলার ভয় বাড়িয়ে দেয়, অবশ্য মেয়েটাকে সে খুঁজেও পায় নি। খুঁজে পেয়েছে মেয়েটা স্বয়ং, হারিয়ে ফেললে সেই ফেলবে, শফিক তো না। শফিক আবার হাসল। কি বোকার মতন ভাবছে এসব। একজন হারিয়ে ফেললেই তো খেলা শেষ। আমি তোমার থেকে দূরে -যে কথা; তুমি আর আমার কাছে নেইও সেই কথা। নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে শহর ছেঁয়ে যাবে, প্রেমিক প্রেমিকারা সব হারিয়ে গেলে।
৭.
নিশি কন্যা চুপচাপ বসে আছে। আজ তাকে কেও ফোন করে নি। একটু আগে সে একটা নম্বরে ফোন করেছিল। মানুষটা ব্যস্ত থাকায় ফোন ধরে নি। তার খুব একা লাগছে। একাকীত্বের সংজ্ঞাটা সে জানে না। আমি একা তারমানে এই না যে, আমার সাথে কেও নেই। আমি একা তারমানে এই যে, আমি কারও সঙ্গে নেই। কারও হয়ে থাকা আর কারও পাশে থাকাটাও এক নয়। পাশাপাশি প্রেমিক প্রেমিকা বসে থাকলে দুজনে মিলে ভালবাসা ভালবাসি হয়। আর কারও হয়ে থাকলে আপাত দৃষ্টিতে দুজন প্রেমিক প্রেমিকা দ্যাখলেও তারা আসলে একজনই, দুজনকে আলাদাভাবে দ্যাখার সুযোগ নেই। এটাই মূলত, কারও হয়ে থাকা, আর পাশে থাকার মধ্যকার তফাত।
নিশি কন্যা চমকে উঠল। একটু আগে যে নম্বরে সে ফোন দিয়েছিল, তিনি তাকে ব্যাক করেছেন। নিশি কন্যা আনন্দচিত্তে মিহি কণ্ঠে বলল, কেমন আছেন?
ওপাশের মেয়েটা ভারী গলায় বলল, কে আপনি?
আমি জিন কন্যা। আমার বাবার নাম, হিহিরাতুনা ফারাট বাগুন আসসালাতু লিমিহান। আমি তার একমাত্র কন্যা। আমার কোনও নাম নেই। আচ্ছা আপনার নাম কি?
মেয়েটা ফোন রেখে দিল। নিশি কন্যা ভীষণ অবাক হলো। মানুষ কেন এমন করে সে জানে না। সে সিগমুণ্ড ফ্রয়েড পড়েছে, কিন্তু এর বিন্দু-বিসর্গও বুঝতে পারে নি। মানুষের আচরণগুলো তাকে যথেষ্ট হতাশ করে চলেছে। তার চোখে পানি চলে আসছে। সে কান্নার রাগ নিয়ে মেয়েটাকে আবার ফোন করল। দু’বার রিঙ হতেই মেয়েটা ফোন রিসিভ করল। রিসিভ করেই গরম গলায় বলল, কি সমস্যা?
নিশি কন্যা ভেজা চোখ মুছতে মুছতে বলল, আপনি এমন করলেন কেন? জানেন, আমি কত কষ্ট পেয়েছি?
তাতে আমার কি! কে আপনি? রাতবিরেতে মানুষকে এভাবে ডিস্টার্ব করার কি আছে?
আমি ডিস্টার্ব করলাম কোথায়? আমি তো জিন কন্যা। খুব ছোট আমি। কেও আমার সাথে খেলে না, কথা বলে না। তাই মানুষকে ফোন করি, আমার সময় কাটে না। বাবা একটা দুষ্ট জিনকে খুঁজছে। দুষ্ট জিনটা ফাঁসির আসামী। ও পালিয়েছিল। এখনও ধরা দিচ্ছে না। মা-ও নাকি খুব ব্যস্ত, আমি একা একা থাকি।
মেয়েটা কঠিন গলায় বলল, দুঃখিত! আপনার সাথে নষ্ট করবার মতন সময় যে আমার হাতে নেই।
নিশি কন্যা ভারী গলায় বলল, এখন আমার কি হবে? আমার সাথে কেও কথা বলে না। আপনি একটু বলুন প্লিজ। আল্লা আপনার মঙ্গল করবে।
জিনদের দোয়া কবুল হয়?
হবে না কেন? ওরাও আল্লাহর সৃষ্টি।
আচ্ছা সরি। কিন্তু আমার হাতে সময় নেই।
নিশি কন্যা কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, এমন করেন কেন আপনারা? কি সমস্যা আপনাদের? গিনি পাস পাক তুটরিয়া।
মেয়েটা ভীষণ অবাক হয়ে বলল, গালি দিচ্ছেন?
গালি কি?
বেয়াদব মেয়ে কোথাকার!
নিশি কন্যা অবাক হয়ে গেল। বেয়াদব শব্দের অর্থ সে জানে। তার মন আরও বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে মুখ ভার করে বলল, আপনি আমাকে এটা বলতে পারলেন? লিকিগা ডুসরা কজটানু আতারা। মিহিতাগুলো ওরাজীব জীনতা মেরি হাদুরিটা সাহাবান।
মেয়েটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দ্যাখছিল। কাল তার জমা দেবার ডেডলাইন। তাই এই রাতজাগা। এমন সময়ে এ ধরনর বিরক্ত কারওরই কাম্য নয়। মেয়েটা এবার চূড়ান্ত রেগে বলল, অসম্ভব বেয়াদব তো তুই! এগুলা কি বললেন? রাতবিরেতে এমন কথা বলার মতো বাজে কাজ আপনাদের দ্বারাই সম্ভব। পুলিশে দেয়া উচিত। তোর ঠিকানা দে হারামজাদি। আমার কাজের উপর থেকে মুড উঠিয়ে নিয়েছিস তুই। কি বেয়াদব রে বাবা।
নিশি কন্যা ভয় পেয়ে বলল, সারউয়া প্লিজ সারউয়া।
ছি ছি! কি অশ্লীল! তুই কি বলতে চেয়েছিস আমি বুঝছি ঠিকই। দাঁড়া, লোকেশন ট্রেস করছি। বাঙলাদেশে গাঁজার দাম সস্তা হওয়াতে কি যে মসিবতে আছি, তা অর্থমন্ত্রীর একবার স্বচক্ষে দ্যাখা প্রয়োজন।
আচ্ছা আপু, অর্থমন্ত্রী কি?
কে তোর আপু? জিন আবার আমার বোন হয় কিভাবে? চুপ থাক! পুলিশে দিলেই অর্থমন্ত্রী দ্যাখতে পাবি।
আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন?
তো কিভাবে কথা বলব? তোর সাথে খেলবো? কি খেলার কথা বললি তুই আমাকে? রাতবিরেতে কি খেলতে চাস তুই? সমকামীদের আমি ঘৃণা করি না সত্য, তবে তাদেরকে আমার ঠিক পছন্দও না।
নিশি কন্যা অবাক হয়ে বলল, আপু, সমকামী মানে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *