Breaking News
Home / দেশ প্রেম / লেখকের প্রেম ৮ম পর্ব

লেখকের প্রেম ৮ম পর্ব

আমি সাধুবাবার মুখের দিকে তাকালাম। এদের নাম কেন সাধু রাখা হয়, জানি না। পবিত্র পাপ -বলেই কি না!
রাতে নানা আরেকটা আবদার করে বসলেন। তার জামাকাপড় নাকি অনেক ময়লা হয়ে গেছে। খুব খুশি হতেন, যদি আমরা তা ধুয়ে দিই। এবার আর প্রশ্রয় দেয়াটা বোকামি হবে। মুখের উপর বলে দিয়েছি, আহা নানা, বলেন কি? বাসায় তিনটা কাজের মানুষ। নিজের কাপড়টাও তো কখনও ধুই নি, আপনারটা ধুবো কিরূপে…?

সকালে গানের আসর বসল। আমাকে দিয়ে দুটা গান করানো হয়েছে। গান গাইতে দারুণ লাগছিল। শ্রোতাদর্শক মুগ্ধ। দর্শক সংখ্যা তেরো জন। সবাই আশেপাশেই থাকে। গান শেষ হওয়ার পর সবাই হাততালি দিলেও শুধু বোরকা পরা একটা মেয়ে হাততালি দিচ্ছে না। তার বোধহয় আমার গানগুলি পছন্দ হচ্ছে না। পছন্দ হলে নিশ্চয় দিত। আমি নিজের মতন করে গান গেয়ে যাচ্ছি, মানুষ মরলে পরে বিচার হবে কার?
আমি বুঝলাম না ব্যাপার…
ও মানুষ মরলে পরে বিচার হবে কার?
আমি বুঝলাম না ব্যাপার।
কে বলে মানুষ মরে-রে-রে-রে…
আমি বুঝলাম না ব্যাপার।
এই গানটা খুব আবেগ দিয়ে গাইছি। গাওয়ার সময় চোখ জলে ভিজে আসছিল। গান বোধহয় এমনই হওয়া উচিত। কিছু শিল্পী লিরিক দ্যাখে গান গায়, আর কিছু শিল্পীর বুকের ভেতরে জমা কষ্ট-টাই লিরিক হয়ে বের হয়ে যায়। এই দ্বিতীয় শ্রেণির শিল্পীরাই প্রকৃত শিল্পী।
গান শেষ হলো। আমি আসর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, এমন সময়েই বোরকা পরা মেয়েটা আমার হাত খপ করে ধরে ফেলল। আমি হতভম্ব হওয়ার আগেই সে প্রায় আমাকে উড়িয়ে নিয়ে বাসে উঠালো। বাসের পাশের সিটে বসে বোরকা খুলে ফেলল। আমার রেশ তখনও কাটে নি। আমি ধরা গলায় বললাম, সুপ্তিকা, তুমি?
হুম আমি।
আমরা কোথায় যাচ্ছি সুপ্তিকা?
আমার বাসায়।
না সুপ্তিকা, আমি লালন ছেড়ে কোথাও যাব না।
প্রচণ্ড জোরে একটা আওয়াজ হলো। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারি নি। যখন বুঝলাম, তখন দ্যাখলাম, আমি থাপ্পড় খেয়েছি।
সুপ্তিকা আমাকে নিয়ে তাদের বাসায় এল। বাসার দরজা খুলে দিল কাজের মেয়ে কহিনুর। কহিনুরের বয়স কম, চব্বিশ হবে হয়তো-বা। আমাকে দ্যাখে সে জিন দ্যাখার মতন চমকে উঠল। আমার পোশাক সাধারণই। গলায় ইপিলইপিল গাছের বিচির মালা, কমলারঙের পাঞ্জাবি, শাদা পায়জামা আর রাবারের স্যান্ডেল। মাথায় ময়লাটে পাগড়ি। কহিনুর দরজা খুলেই দৌঁড় দিয়ে ভেতরে গেল। আম্মা আম্মা বলে চেঁচিয়ে উঠল। আম্মা তার সামনে আসামাত্রই সে আমরা যেন না শুনি তেমনকরে ফিসফিসিয়ে বলল, আম্মা আম্মা, মিষ্টি আপা একটা ডাকাইত ধইরা আনছে। বাসায় ডাকাইত পড়ছে আম্মা। তাড়াতাড়ি ভাগেন! আমার মনে হয়, ডাকাইতটা আপারে ধইরা এখন টাকা চাইব। আম্মা কিছু করেন আম্মা।
কহিনুরের চোখে জল চলে এল। সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। আন্টি পরিস্থিতি সামলে নিয়ে চোখমুখ থেকে ভয়েরচিহ্ন দূরে সরিয়ে ডাকাত দ্যাখতে রুমে এলেন। সুপ্তিকা হাসিমুখে বলল, আম্মু, ওর নাম ইমরান হোসাইন ইমু। আমার বন্ধু। ঢাকায় থাকে। লেখালেখি করে টুকটাক। ওখান থেকেই পরিচয়।
আমি আন্টির দিকে তাকিয়ে দু’হাত জড়ো করে তা মাথায় লাগিয়ে বললাম, জয় হোক আন্টির।
আন্টি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চূড়ান্ত হতভম্ব এবং বিরক্ত হলেন। বাসায় ডাকাত না পড়লেও পাগল যে এসে পড়েছে, তা নিসন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আন্টির বোধহয় আমাকে বসতে বলার রুচি হচ্ছে না। মনেমনে যে এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন, তা আমি বিলক্ষণ জানি। তবুও আমরা মুখের কথার প্রত্যাশী। তাছাড়া গুরু লালন তো বলেছেনই, সারাবিশ্বই তোর ঘর রে পাগলা!
সু্প্তিকা আমাকে বসতে বলল। আমি ঠুস করে বসে পড়লাম না। ব্যাগ থেকে একটা খয়েরী রঙের মাদুর বের করে তা সোফার উপর বিছিয়ে দিলাম। তার উপর সামান্য পরিমাণে রঙিন মোমের গুড়া ছিটিয়ে তার উপর বসলাম। আন্টি ভয় ভয় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। চা-নাস্তার ব্যবস্থা না করেই তিনি উঠে ভেতরের রুমে চলে গেলেন।
দুপুরবেলায় আমার জন্য পাটশাক, তেলাপিয়া ভাজি আর ডাল করা হয়েছে। নিশ্চয়ই সুপ্তিকারা আরও ভালো খাবার দিয়ে লাঞ্চ করে, কিন্তু আমার মতন ছেলের জন্য সেসব খাবারের অপচয়রোধ করতেই বোধহয় এই আয়োজন। আমার তাতে সমস্যা হচ্ছে না। লালন বাবার দরবারে শুকনো খিচুড়ি গলায় আঁটকে গিয়েছিল। পানি পানে তা নেমেছিল বলেই রক্ষে! আমি ডাস্টবিনের খাবারও খেতে পারি। সমস্যা হয় না তো! সুপ্তিকা আমার পাশে বসে আছে ওপাশে আন্টি, আংকেল আর ছোট দুটা ছেলে। পিঠাপিঠি একেবারে। বয়স হবে ৮/৯ বছর। আমার দিকে তারা চোখ বড়বড় করে তাকাচ্ছে। আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে হাসছি আর খাচ্ছি। আংকেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি ঢাকায় থাকো?
জি।
কি করো?
আমি শব্দ শ্রমিক।
আংকেল চট করে খাওয়া বন্ধ করে ফেললেন। আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, তারমানে?
জি, আমি লেখালেখি করি। শব্দের সাথে শব্দ মিলাই।
খুবই ভালো কথা। তা কুষ্টিয়াতে কেন?
বাবার দরবার দ্যাখতে এসেছি।
দ্যাখা হয়ে গেছে?
জি না। বাবার দরবার কি একবার দ্যাখলে সাধে? সারাজীবন এখানেই থাকার প্ল্যান আছে।
শুনে খুশি হলাম।
সুপ্তিকা কোনও কথা বলছে না। আমার সাধু বেশ-টার কারণে অনেকে অনেক কথা বলছে। অথচ আমি তাদের খাই না পরি? মানুষের কৌতুহলের সীমা নেই। সেদিন একটা রিকশাচালককে রাস্তার মোড়ে কি অমানুষিক মারটা না দিলেন এক ভদ্রলোক। সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে। একজন মোবাইল হাতে ভিডিও করছে, একজন দু’হাত বুকের উপরে জড়ো করে আয়েশি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, কেওবা চেয়ার টেনে এনে বসে সিগারেট টানতে টানতে দ্যাখছে। কারও হাতে বিকেলের চায়ের কাপ।
আংকেল আবার বললেন, তোমাদের আখড়াতে তো অনেক দেহ ব্যবসায়ী মেয়ে পাওয়া যায়। রাইট?
আমি পতিতার দালালি করি এমন ভঙ্গিতে হেসে বললাম, একদম রাইট। আপনার কয়টা লাগবে? বয়স সীমা ১৬-২৩ এর মেয়েদের আলাদা ডিমান্ড। কচি মেয়েও আছে। প্রথমবার আপনার সাথে করবে, এমন মেয়েও আমি এনে দিব। চিন্তা করবেন না। ফার্স্ট টাইম-ওয়ালা মেয়েরা পরিচিতি ছাড়া আসে না। আমার তো পরিচিতি আছে। আমার মাধ্যমেই আপনি পেয়ে যাবেন। দ্যাখেন অবস্থা, লিংক ছাড়া চাকরিও পাওয়া যায় না, কচি মেয়েও পাওয়া যায় না।
আংকেলের সাথে-সাথে আন্টিও এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। এমন বেয়াদবকে সুপ্তিকা কেন বাসায় এনেছে, তার জন্য সুপ্তিকার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। সুপ্তিকা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে মাথানিচু করে বলল, চুপ করে খাও।
আমি চুপ করেই খাচ্ছি। কেও প্রশ্ন করলে জবাব দিই, এই তো!
খাওয়া শেষ হয়েছে। কহিনুর ফ্যাকাসে মুখে প্লেট নিতে এসেছে। আমার দিকে সরাসরি তাকাতে তার রুচি হচ্ছে না, বোধহয় ভয় হচ্ছে। আমি খাওয়া শেষ করে শূন্য প্লেটে পানি ঢেলে তাতে এক চিমটে লবণ আর লেবুর রস মিশিয়ে পানিটা খেয়ে দু’হাত জড়ো করে তা মাথায় লাগিয়ে বললাম, আমাকে এত ভালোভাবে খাওয়ানোর জন্য আপনাদের অনেক কৃপা। কৃপাময় আংকেল এবং আন্টির জন্য ভালবাসা অবিরাম।
কহিনুর বিধ্বস্ত চোখে আমার প্লেট-টার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বোধহয় এই প্লেটটা স্পর্শ করতেও ভয় পাচ্ছে।
বিকেল বেলায় পিচ্চি ছেলে দুটাকে আমাকে দেয়া রুমটা-তে নিয়ে গেলাম। আমি গান ধরেছি। তারা সুর মিলিয়ে গাইছে। তারা বোধহয় অনেকদিন পর আজ একটু আনন্দ করতে পারছে। দ্যাখে নিজেরই ভীষণ ভাল লাগা কাজ করল। আংকেল ভেতরের রুমে সবেমাত্র পত্রিকা নিয়ে বসেছিলেন। আমার বেসুরা গলায় গানের বিকট শব্দে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তিনি দাঁতমুখ কুঁচকে হড়বড় করে আমার রুমের দিকে এগিয়ে আসছেন। পত্রিকা-টা যে পড়তে দেয় না, তার সাথে নয় লেনাদেনা। আজই, খুব সম্ভব এখনই আমাকে হয় মেরে ফেলা হবে, নয়তো হাত-পা, সাথে মুখটা বেঁধে তারপর তিনি পত্রিকায় পড়ায় মন দিবেন। আমি আমার রুমে মুগ্ধ শ্রোতা দুই বালককে নিয়ে মনের আমেজে গেয়েই চলেছি, মরার দেশে ভাল লাগে না
ও মরি, উপায় কি যে বল না
মরার দেশে ভাল লাগে না।
মরায় মরায় যুক্তি করে
জিন্দা ধরে খায়,
মরায় করে রাজ্যশাসন
মরায় দেশ চলায়…
(চলবে)

About online

Check Also

লেখকের প্রেম ৪র্থ পর্ব

লেখকের প্রেম ৪র্থ পর্ব

প্রেমিকার মুখ থেকে তার মা সম্পর্কে একটা সত্য শুনেছি। সত্যটা হল, মহিলা হালিমের লবণ টেস্ট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *