Breaking News
Home / ভালবাসার গল্প / রৌদ্রজ্জ্বল রাত্রি শেষপর্ব

রৌদ্রজ্জ্বল রাত্রি শেষপর্ব

জহির সাহেব রোবট মেয়েটার দিকে তাকালেন। তাকে কেমন লাগছে, সেটা সে না জেনে যাবেই না। তাকে দ্যাখতে অসহ্য সুন্দরীর মত হলেও তাকে কেও বিয়ে করতে পারবে না। মানুষের মন আছে, রোবটের তা নেই, রোবটের মধ্যে সামান্য মায়া সেট করা গেলেও তা প্রযুক্তিগত, প্রকৃতি প্রদত্ত নয়। জহির সাহেব মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে তিনুর মতো লাগছে।
মেয়েটা বোধহয় কিছুক্ষণ হাসলো। তারপর মুখ লুকিয়ে চলে।
বেশ কিছুদিন ধরে তৃষাণা এনার্জি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে। কিছুটা এনার্জি হয়েছেও। তবে এত কম এনার্জি দিয়ে জহির সাহেবকে ছোঁয়া যাবে না। আবার বিস্ফোরণের সময়ও বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। ঠিক কোন ব্যাপারটা আগে ঘটবে, সে ব্যাপার নিয়ে সে ভীষণ সন্দিহান।
৪.
জহির সাহেব একটু আগে মজিবের বাসা থেকে বের হয়েছেন। মজিব তাকে দ্যাখে ভীষণ খুশি হয়েছে। সে আগেই বিপদের আশংকা প্রকাশ করেছিল, তা সত্যি হওয়াতে তার মধ্যে কেমন যেন একটা বীরত্বের ভাব ফুটে উঠেছে। মানুষ যদি বলে, দ্যাখে নিও গাড়িটা এত দ্রুত চলছে, এক্সিডেন্ট করবেই। তখন এক্সিডেন্ট করলে সে হো হো করে হেসে বলে, দ্যাখেছো…? কিন্তু সেও যে একই গাড়ির সদস্য, এবং তাকেও যে হাসপাতালে যেতে হবে, এবিষয়টা তখন তার মাথায় থাকে না। মজিব তৃষাণাকে তাড়াবে না। সে নাকি কোন লোককে আনবে, সেইই তৃষাণার সকল ডিভাইস নষ্ট করে দিবে, তৃষাণা আঘাত করার আগেই হলোগ্রাফিক পর্দায় তার সমস্ত এনার্জি অন্য ডিভাইসে কনভার্ট করা হবে। সমস্ত এনার্জি কনভার্ট করার একটু আগে অর্থাৎ বিস্ফোরণের একটু আগে তার মাথার খুলি খুলে রাখা হবে। আপদ দূর না করলে জহির সাহেবের মতন সাধারণ মানুষটা মারা যাবেন। জহির সাহেব ভীষণ উপকৃত হয়ে মজিবকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার বাসা ছেড়েছেন। কিন্তু কিছুটা হাঁটার পর তার মনে হলো, না, তৃষাণাকে এভাবে ধ্বংস করা ঠিক হবে না, তার ভীষণ কষ্ট হবে। আবার জহির সাহেব নিজেকে বোঝাচ্ছেন, না, তৃষাণা একটা রোবট। ওর মধ্যে কোনও আবেগ, ভালবাসা নেই। তার জন্য যদি নিজেকে মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হয়, তবে ওকে নিঃশেষ করাই ভালো। তার উপর তার স্ত্রীর কবরটাও হয়তো বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা তিনি কখনওই মানতে পারবেন না। আবার জহির সাহেব ভাবছেন, তার স্ত্রী তৃষাণার মাঝে ফিরে এসেছে। তৃষাণা অবিকল শুধু তার স্ত্রী কেন, তিন্নিকেও নকল করে করতে পারে। অবসর সময়ে মেয়েটার সাথে কথা বলে সময় কাটানো যাবে। আবার তার মস্তিষ্ক ভাবছে, না! কিছুদিন পরে বিস্ফোরণেই তো সব শেষ। জহির সাহেব এখন কনশাস আর সাব-কনশাস মাইন্ড নিয়ে বিপদে আছেন, তার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, তৃষাণার মতন রোবট হলেই বোধহয় ভালো ছিল!
জহির সাহেব কি ভেবে দুটা শাদা গোলাপ কিনলেন। মাঝেমাঝেই তার স্ত্রীকে দিতেন, আজ দিবেন তৃষাণাকে। মেয়েটা কি উপহার পেলে খুশি হবে? তাকে মেরে ফেলার আগে তাকে খুশি রাখা উচিত। সে খাদ্য গ্রহণ করে না, তা না হলে তিনি নিজেই তৃষাণার জন্য রাঁধতেন। জহির সাহেব ধীর পায়ে বাসায় পৌঁছলেন। পকেটে এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে খুব শান্তভাবে ডাকলেন, তৃষাণা।
কোনও জবাব নেই।
আবার ডাকলেন, তৃষাণা, একটু এদিকে আসো।
পুরো ঘর নিশ্চুপ। তিনি হতভম্ব হয়ে পুরো ঘর তল্লাশি করলেন, তৃষাণার কোনও চিহ্নও নেই, কোনও চিরকুট নেই, নেই কোনও চিঠিও। জহির সাহেব বিছানায় বসে পড়লেন। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। খুব সম্ভব, এই শহরে তুফান হবে আজ। তার মনে হচ্ছে, তার শরীরের পারদেরও আজ তুফান হবে।

বেশ অনেক বছর পরের কথা…
কয়েকজন বনভোজন করতে এসেছে। পাশেই জহির সাহেবের বাড়ি। বাড়ির ভেতর দুটা কবর, একটা তার, বাকিটা তার স্ত্রীর। অনেকের কাছেই এটা ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বামী তার মৃতা স্ত্রীর কবরের সাথে দীর্ঘদিন বাস করেছেন। আজ মৃত্যুর পরও তারা পাশাপাশি, কাছাকাছি। বাড়িটার সবকিছুই ঠিক আছে, তবে মাঝেমাঝেই সেখানে বেশ কয়েকজন মানুষ হার্ট-এটাক করে মারা যান। সাহসীরা এখানে রাত কাটাবার কথা ভাবে। আজও হয়তো ছেলে-মেয়েগুলো এখানে রাত্রি যাপন করবে। হয়তো কাওকে শত্রু মনে(!) হলে সে হার্ট-এটাকে মারা যাবে। ফিরোজা নামের মেয়েটা সিগারেটে টান দিতে দিতে বলল, আসলে ঘটনা অন্য। বেশ অনেক বছর আগে নাকি একটা রোবট সুইসাইড করেছে। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও নাকি ঘটনাটা সত্যি। খুব সম্ভব সে কিছু পেতে চেয়েছিল, কিন্তু পায় নি।
গিফরী হাসতে হাসতে বলল, প্রাণীজগতে সাপ, বানর এমনকি হরিণকেও সুইসাইড করতে শুনেছি; কিন্তু রোবটের কথা এই প্রথম। হা হা হা!
ফিরোজা বিরক্তমুখে বলল, আজব! লোকমুখে কথিত। আমি কি সিউর জানি নাকি…? রাত হলে নাকি সে রোবট-টা কবর দুটা পাহারা দেয়। জানি না সঠিকটা। অনেকটা প্রভুভক্ত কুকুরের মতন।
রাত আরও বাড়ছে। বনভোজন টিম বসে আছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়বে মাটির উপর। মাটির নিচেই তো দুজন শুয়ে আছে, তাই তারা মৃত, আর আমরা মাটির উপর শুই বলে আমরা জীবিত। উপরের তলার মানুষগুলো সবসময়ই ভালো অবস্থানে থাকে, এটা কি ঠিক…?

রাত বাড়ছে, দিন এগিয়ে আসছে। ভোরের অপেক্ষায় শত শত রাত্রি বসে আছে। ভোর দিনের শুরু, রাতের শেষ। না দিন, না রাত্রি। আলো আঁধারির খেলা। ঠিক এই সময়েই জহির সাহেবকে প্রথম জড়িয়ে ধরেছিল তার স্ত্রী, এমন ‘না দিন না রাত্রি’র নাম দিয়েছিল “রৌদ্রজ্জ্বল রাত্রি”…

About online

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *