Breaking News
Home / দেশ প্রেম / লেখকের প্রেম ৩য় পর্ব

লেখকের প্রেম ৩য় পর্ব

আমি একটা ভাল রকমের শিক্ষা পেয়েছি। আর কখনওই ছোট মেয়েদের টিউশনি হাতে নিব না, ভুলভাবে হাতে নিয়ে ফেললেও, দু’হাত নিমপাতার সাবান দিয়ে ধুয়ে ফকফকে করে ফেলব। পিচ্চি মেয়েগুলো যদি প্রশ্ন করে, আচ্ছা ভাইয়া, বাবু কিভাবে আসে? তাহলে নিজেকে সংযত রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। আমি করুণ চোখে আন্টির চোখের দিকে তাকিয়ে কচকচে পাঁচটা পাঁচশ টাকার সেলারী দ্যাখছি। আন্টির চোখ লাল হয়ে গেছে। নির্মলেন্দু গুণের ‘তোমার চোখ এত লাল কেন’ কবিতাটার কথা মাথায় চলে এল। আন্টির দিকে তাকিয়ে বত্রিশটা দাঁত বের করে কবিতাটা পাঠ করব কিনা তাই ভাবছি। আমার মনে হয় না, তার কোনও প্রয়োজন আছে। আন্টি যদি মাঝপথে চরম একটা ধমক দিয়ে বসেন, তাহলে বাচ্চা দুটোর সামনে আত্মসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আন্টি আমার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ইমু।
আমি খুবই মিষ্টি করে হেসে বললাম, জি আন্টি?
তুমি ইমাকে কয় সাবজেক্ট পড়াও?
যত সাবজেক্ট সে স্কুলে পড়ে।
বায়োলজি কি ক্লাস টুতে আছে?
জি না।
তাহলে তুমি কি আদিম কালের সক্রেটিসের মতো সব বিষয়ে বাচ্চাদের জ্ঞান দিচ্ছো কেন…?
আমি মাথা নিচু করে রইলাম, কোনও জবাব দিলাম না। আন্টি ব্যাপারটা ধরতে পারলেন না, অথবা ধরতে পেরেও তিনি কাটা গাঁয়ে নুনেরছিটে দিতে আরও বললেন, সেদিন ইমা আমাকে এসে বলল, তুমি নাকি মানবদেহের অতি নিম্নতর অঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছো। তুমি ইমাকে ‘পাছা’ বলা শিখিয়েছ। এটা কি অন্যায় নয়?
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। মনে করার চেষ্টা করতে করতে বললাম, আমি তো কোনওদিন এমনটা শিখিয়েছি বলে মনে পড়ে না। কি বললেন এটা?
তোমার মনে না পড়লেও আমার পড়েছে। ইমা মেয়েমানুষ, তুমি ছেলে হয়ে আজ তাকে পাছা বলা শিখালে, কাল শিখাবে অন্য আরেকটা। আমি প্রথমে তোমাকে ছাড় দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি এখন তাকে বাবু জন্মের প্রসেস হাতে কলমে শেখাচ্ছো, এসব কি চলছে? আগের টিউটরকে বাদ দেয়া হয়েছে তার চরিত্রগত ত্রুটি থাকার কারণে। তিনি অতি জঘন্য চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বান্দরবনের পাহাড় নাকি মেয়েরা শরীরে বয়ে চলে। আমি তোমাকে ভাল ভেবেই মেয়ে দিয়েছি। ভেবেছিলাম, লেখক মানুষ, মনভোলা। এতকিছুর দিকে মন নেই, বোকাসোকা, তবে জ্ঞান আছে। তাতেই আমার সই। মেয়ে পড়বে আর ভাল কিছু শিখবে। মাস শেষে তুমি টাকা নিয়ে তামাক খাবে আর হুক্কুর হুক্কুর করে কাশতে কাশতে ফার্মেসি থেকে কাশির সিরাপ কিনে ঘরে ফিরবে। এখন দ্যাখছি তুমিও অতি নিম্ন শ্রেণীর প্রাণী। ছোট মেয়েকে পাছা শিখাচ্ছো। ছি ছি!
ইমা আমার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যস্তভাবে আম্মুর দিকে তাকিয়ে সত্যটা বলে দিল, আম্মু, পাছা না তো, ভাইয়া বলেছিল, চার পাছা বিশ, পাঁচ পাছা পঁচিশ। পাঁচের নামতা।
মূর্খ ভদ্রমহিলা চোখমুখ গরম করে উত্তেজিত হয়ে বললেন, তুই চুপ কর। অই একই কথা! শোনো ইমু, বাচ্চা মানুষকে যেমন শেখাবে, তেমন শিখবে। পাঁচের নামতা অন্য কোনওভাবে শেখাও। দরকার হলে শেখাবাই না। পাঁচের নামতে শেখাতে গিয়ে আবার পাছায় নামলা কেন -বুঝলাম না। পাঁচ থেকে যদি বাচ্চা মেয়ে পাছা শিখে, তবে সেটা শেখানোর চাইতে মূর্খ থাকা ঢের ভাল। বুঝেছো?
আমি শান্ত গলায় বললাম, বুঝেছি।
আর বাবু আসার প্রসেস শেখাচ্ছো কেন?
ইমা আবার ব্যস্ত ভাবে বলে উঠল, মা, আমিই আসলে বলেছিলাম, বাবু কিভাবে আসে? আসলে সোমার ঘটনাটা তো তুমি জানোই। তার চিন্তা দূর করার জন্য বলছি। আমার দোষ। তবে আমি এতে কোনও দোষ দ্যাখি না। বাবু হওয়াটা কি খারাপ মা?
মা প্রচণ্ড রেগে বললেন, খুব খারাপ। এগুলা জানার চেষ্টা করবে না।
ইমা মাথা নিচু করে অভিমানী কণ্ঠে মিনমিন করে বলল, তারমানে আমি খারাপ, তাই না মা?
আমি হাসি মুখে বললাম, না ইমা। তুমি খারাপ না। বাবুরা খুবই পবিত্র। বাবু আসার পদ্ধতিটাও ভালবাসাময়।
ইমা খুশি হয়ে চোখ বড়বড় করে বলল, জানো ভাইয়া, সেদিন ক্লাসে ম্যাম ‘Love’ শব্দটার অর্থ শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে ‘ভালবাসা’ সবচাইতে দামী শব্দ। এখন তো তুমিই বললা, বাবু আসার পদ্ধতিটা ভালবাসাময়। তারমানে বাবু আসার পদ্ধতিটা পৃথিবীর সবচাইতে দামী পদ্ধতি। ভাইয়া বল বল, পদ্ধতিটা কি?
এবার সোমাও যোগ হয়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, হ্যাঁ ভাইয়া বল বল। চুমু খেয়ে আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। মুরগী দ্যাখলে আমার খুব ভয় করে, তবে চুমুর ভয় সবচাইতে বেশী। আমি এখন থেকে পৃথিবীতে সবচাইতে বেশী ভয় পাই, চুমুকে। তুমি এবার ভালো করে বুঝিয়ে দাও তো, কিভাবে বাবু আসে।
বাচ্চা দুটা অধীর আগ্রহে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তখন অই কথাটা আমি না বললেও চলত। কেন বলেছিলাম, তা নিজেও জানি না। আন্টি আবার চোখমুখ শক্ত করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে না বলেছি, কথা কম বলতে?
আমি মাথা নিচু করে কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললাম, জি না, বলেন নি।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তখন মানা করে দিলে এই অঘটনটা আর ঘটতো না।
৩.
সাবিলা আমাকে ফোন দিয়েই কাঁদতে থাকল। আমি চুপ করে তার কান্না শুনছি। কান্না শোনার সময় আমার ভেতর খুব করে কান্না পায় না। পেলেও হাসি হাসি মুখে সেই কান্না হজম করতে পারি। সাবিলা কান্না করতে করতে বলল, জানো, আম্মু না আব্বুর সাথে তিতিরের বিয়ে দিয়ে দিবে।
আমি হাসিমুখে বললাম, আলহামদুলিল্লাহ। তা কবে হচ্ছে? কার্ড ছাপানো হয়েছে?
সাবিলা চমকে উঠল। সে এমন জবাব আশা করে নি। তার ভেতরে অপ্রত্যাশিত ব্যাপারগুলো সহজে গ্রহণ করার মতো মন সৃষ্টি হয় নি। সে রেগে উঠে বলল, কি বললা তুমি?
আলহামদুলিল্লাহ। তা কবে হচ্ছে? কার্ড ছাপানো হয়েছে?
তুমি বুঝতে পারছো, ব্যাপারটা কত সিরিয়াস? আমি যাকে এতদিন বান্ধবী ভেবে আসছি, এখন তাকে মা বলে ডাকতে হবে।
ভালই তো। নতুনত্ব আসা উচিত। আচ্ছা, তুমি কি বিবর্তনবাদ পড়েছো?
ফাযলামি বন্ধ।
বিবর্তনবাদ ফাযলামির কোনও ইস্যু না, সিরিয়াস টপিক। ডারউইন ভাইয়া বলেছেন, আমরা আগে বানর ছিলাম। লক্ষ, কোটি বছরের মিউটেশনের ফলে আজকের মানুষের আকৃতি পেয়েছি। ভবিষ্যতেও কি আমরা এমনিই থাকব…? শোনো একটা সত্য ঘটনা বলি, বেশ অনেক বছর আগে জার্মানির এক জার্নাল বলেছে, একবার তারা এক গর্ভবতী নারীর ডেলিভারি করাচ্ছে। ডেলিভারি শেষে সবারই আগ্রহ থাকে বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে, এনিয়ে জামাকাপড় কেনার। কিন্তু ডাক্তাররা অবাক হয়ে দ্যাখলেন, নারীটার পেট থেকে একটি লোমশ আকৃতির দানব বেরিয়ে এসেছে, যার চোখ দুটো অবিকল মানুষের মতো, কিন্তু শরীরটা অন্য কোনও অজানা প্রাণীর। ডাক্তাররা চমকে উঠলেন। এটা ঘটার কথা ছিল না, কিন্তু এই অলৌকিক ব্যাপারটাই বাস্তব। এই প্রাণীটাকে কি করা যায় কি করা যায় -ভাবতে ভাবতে তারা ডিসাইট করলেন, একে মেরে ফেলবেন, কারণ, প্রাণীটা মানুষের মতন আমাদের শহরে বাস করতে পারবে না। আবার প্রাণী হয়ে বনেও যেতে পারবে না। কারণ প্রাণীটাকে কোনও প্রাণী জন্ম দেয় নি, মানুষই জন্ম দিয়েছে। প্রাণীটাকে ডাক্তাররা মেরে ফেললেন। মৃত্যুর আগে নাকি প্রাণীটা অস্ফুটভাবে কিছু একটা বলেছিল, হয়তো মা মা বলে ডেকেছিল। তাকে ফ্লোরে বসিয়ে লোহার রড দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। মৃত্যুর আগে সে মায়ের পেটে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে উঠে বসেছিল। মায়ের বুকের দিকেও হাত বাড়িয়েছিল। মা তখন অজ্ঞান। মা মৃত্যুর আগে সন্তানকে দ্যাখতে পারেন নি। এই যে তোমাকে যা বললাম, তা নিয়ে জীববিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলেছেন, এখন আমরা মিউটেশন করে হয়তো অন্য প্রাণীতে কনভার্ট হতে পারি। তার জন্যও বোধহয় লক্ষ বছর সময় লাগবে। এটা হলো নতুনত্ব। তাই আমাদের নতুনত্বের পূজা করতে হবে। তুমিও বান্ধবীকে মা ডেকে নতুনত্বের পূজা করো। শুভ কামনা রইল।
সাবিলা চুপ করে আছে। তার একটা কমন ডায়ালগ হচ্ছে- তোমাকে যদি সামনে পেতাম! এখনও বোধহয় সেটাই ভাবছে। আমি তার সামনে নেই বলে বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। সাবিলা কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবছে, আমার সাথে আর কোনও কথা বলা উচিত, কি অনুচিত। আমার মতো প্রাণীর সাথে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে কতটুকু ফায়দা হবে তাও ভাবছে। মোবাইলে বিল উঠছে। সাবিলা ফোন রেখে দিল। ফোন রাখার আগে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করল, কিন্তু কোনও কথা বলল না। প্রেমিকা তার চোখের জল প্রকাশ্য করার জন্য প্রেমিকের কাছে ফোন দেয়। প্রেমিকরা কখনওই একাজটা করে না। কারণ ছেলেরা কাঁদলে মানুষ হাসতে হাসতে বলে, বুড়া ছেলে আবার কাঁদেও!
আমি ফোন হাতে বসে আছি। কাকে ফোন দেয়া যায় ভাবছি। ভদ্রমহিলা আসলেই তার স্বামীর বিয়ে দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটা বন্ধ না হলে মহিন সাহেবের সব সম্মান মাটিতে মিশে যাবে, এটা ঠিক হবে না। মহিন সাহেব ভদ্র মানুষ। আমি সাবিলার মাকে ফোন দিলাম। তিনবার রিঙ হতেই তিনি বেশ নরমসুরে বললেন, বাবা ইমু।
জি আন্টি, আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা। শোনো বুড়োটা আসলেই জাত বদমাশ! তোমার কথা কারেক্ট। ওর বিয়ে দিয়ে দিব। পাত্রীর নাম তিতির। মেয়েদের এখানে সেখানে হাত দেয়ার অভ্যাস বন্ধ করে দেয়ার জন্য বুড়ো বয়সে একটা কড়া শাস্তির প্রয়োজন। কি বলো?
তা তো অবশ্যই। আন্টি আপনাকে আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা। আজকালকার ছেলেগুলো খুব বদমাশ! কথায় কথায় তো আকাশের তারা, ফোন দিয়ে একবারও সালাম দেয় না। তুমি অনেক লক্ষ্মীটি! প্রতি কথায় সালাম দাও।
জি শোকরিয়া।
শোনো বাবা, তুমি বদমাশটার সব অপকৃতিগুলো সামনে আনো। প্লিজ বাবা। আর কোথায় কি করে, তা প্লিজ জানাও।
জি তা তো জানানোর জন্যই ফোন দিয়েছি। তবে দুটা শর্ত আছে।
কি শর্ত বাবা?
আগে বলেন মানবেন?
হুম।
আজকের জন্য তিতিরের সাথে বিয়ে স্টপ করে দেন।
তিনি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, দ্বিতীয় শর্ত…?
(চলবে)

About online

Check Also

লেখকের প্রেম ৫ম পর্ব

লেখকের প্রেম ৫ম পর্ব

আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। চিন্তায় পড়ে যাবার মতনই ইস্যু। মেয়েদের ব্লাউজ চুরি করা ক্ষমার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *